গল্প : শুভদীপ মৈত্র

বারো ভূতের গল্প অথবা গৌড় মল্লার

সালে রেন্ডিয়োঁ, মাজাকি হ্যায় কেয়া

প্রায় উড়ন্ত বাইক থেকে ভেসে আসা খিস্তির চোটে তটস্থ মেয়ে বউদের সামনে নাবাল জমির ঢাল বেয়ে সঞ্চারিত হল, বাইকের ধ্বক ধ্বক শব্দ যা এখন ক্রমশ শান্ত ও নিশ্চল। দেবল সিংহ-এর মুখ টানটান ক্ষিপ্র, সামনে তার শুটিং পার্টি, এরা কী একটা ডকুমেন্টারি তুলতে এসেছে। তা নিয়ে দেবলের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই, কারণ এরা সুদূর কলকাতা থেকে এসেছে, যা এখানে ভিনগ্রহের থেকে এতটুকু কাছে নয়।

সবুজ ডাঙার উপর দিয়ে তখন হালকা হাওয়া বইছে, নভেম্বর মাসের, পাতা ঝড়তে শুরু করেছে, ক্রমশ শুকিয়ে হলদেটে হয়ে আসছে চারদিক। মেয়েদের একটা দল দাঁড়িয়েছিল। তারা নির্বাক এখন, কাঁপছে, ভয়ে মুখ শুকিয়ে গিয়েছে, লজ্জায় মাথা নিচু, পালাতে পারলে বাঁচে সেখান থেকে। বাইক বাহিত যে খিস্তি, তার কারণ এরা দেবলের প্ররোচনায় এসেছে নিজেদের অবস্থার কথা ক্যামেরার সামনে জানাতে। ক্যামেরা, যার সামনে কস্মিনকালেও কেউ কথা বলেনি, জানেও না কি বলতে হবে।

গোছানো বাক্য সমাহার এদের কাছে অভিপ্রেতও নয়। ডিরেক্টর সাহেব গতকাল রাতে তার সহকারীকে বলেছিলেন, ‘আরে ক্যামেরা চালু রাখবে যা বলবে তাই তুলবি, এখানকার ভাষাটাও তো শালা বাংলা নয় দেখছি। বলল, এদিকে নাকি হিন্দি মিশিয়ে কি একটা ভাষা বলে, শালা খোট্টাবুলি না কি।’

হুইস্কির অপ্রাপ্তি নিয়ে তিনি তখন বিরক্ত। কলকাতা থেকে এসেছে বড় একটা গ্রান্ট পেয়ে, এখন মনে হচ্ছে, শালা হাওড়া হুগলীর মধ্যেই শুটিং শেষ করে দিতে পারলে ভাল হত, খামোখা টাকা যাচ্ছে, এদিকে কাজ এগোচ্ছে বালের। তার সহকারীর উৎসাহও ফুরিয়েছে, গতরাত থেকে বার পাঁচেক হাগতে গিয়েছে, অ্যান্টাসিডে চলছে না এবার বড়সড় ওষুধ চাই। একমাত্র ক্যামেরা ম্যানটি তাঁর নিরুত্তেজিত, শান্ত, তন্ময়। কারণ প্রথম থেকেই তার কোনো উৎসাহ নেই আশপাশে কি ঘটছে বা না ঘটছে জানার। বহু দিন ক্যামেরার পিছনে চুপচাপ কাজ করার পর সেও প্রায় ততোধিক ঠাণ্ডা ও যান্ত্রিক।

রাতে ঠাণ্ডাটা এদিকে বেশ জমাটি, পশ্চিমবঙ্গের টুঁটির কাছটায়, একটা অন্যরকম চেহারা। ডিরেক্টরের অনেক চেষ্টায় খোঁজা জেলা সদরের সস্তার এই হোটেলটা, জানলার বাইরে এখন কুয়াশা জমছে ন্যাবা রঙের স্ট্রিট ল্যাম্পকে ঘিরে। রাস্তার ওপারের বাড়িগুলো পেরিয়ে তখন দেখা যাচ্ছিল থোকা থোকা কুয়াশার স্রোত আর ইতস্তত ছড়ানো গাছেদের অবয়ব। মায়াবী লাগছিল, চল্লিশের শেষ কোঠায় পৌঁছনো ডিরেক্টর সাহেব জানলার বাইরে তাকিয়ে। আগে হলে ফিচার ফিল্ম বানানোর স্বপ্ন ফিরে আসত, আরো কত কিছু, এখন অভিজ্ঞতার রিয়ালিটি চেক বলছে, এই সব ভাড়াটে কাজেই তার জীবনটা চলে যাবে। এ নিয়ে তিক্ত নয় সে, শুধু হুইস্কির অভাব বিরক্ত করেছিল, আর হ্যাঁ, টাকা খরচ হচ্ছে বেশি, হাতে আর কত থাকবে, এ চিন্তাও ছিল।

‘সব এই দেবলের কারসাজি। এখন ভাল সাজার চেষ্টায় সে রয়েছে অথচ কয়েকদিন ধরে ঘোরাচ্ছিল, দেখাই করছিল না। আর আজকে নিয়ে এল ফেলল কোথায় দেখুন’ একথা ফিসফিসিয়ে ডিরেক্টর সাহেবকে বলল সহকারী। ডিরেক্টর উত্তর দিলেন না। এরপর তারা নিশ্চুপ যদিও জানে এই যা ঘটে চলেছে তাদের সামনে তা তাদের আয়ত্তের বাইরে এবং তার সঙ্গে তারা যুক্ত নয়, ফলে একটা নাগরিক নিষ্পৃহতায় রয়েছে দাঁড়িয়ে, যেভাবে কলকাতার রাস্তায় ট্যাক্সিচালক আর ট্র্যাফিক সার্জেন্ট-এর কথা কাটাকাটি হলে ট্যাক্সির ভিতরের যাত্রীরা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বসে থাকে সেইভাবে।

দেবলের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সে বিষয়ে, সে শুধু দেখে চলেছে বাইকে বসা ফিরোজ আর আখলাক কি করতে চায়। তার নাকের পাটা ফুলে গেছে, কিন্তু নরম স্বরে কথা বলতে শুরু করল, ‘আরে তোমরা কিছু না জেনেই রেগে যাচ্ছ – ’

দুটি গ্রামের মাঝখানে একটি কলোনি, দশ পনের ঘর বসত করে, গত চল্লিশ পঞ্চাশ বছর ধরে রয়েছে, যদিও পাট্টাটাট্টা কিছুই নেই। মুসলমানপ্রধান অঞ্চল, এ অঞ্চলে স্কুলের গণ্ডি পেরোয়নি কোনো মেয়ে, ক’জন গেছে তাই হাতে গুনে বলা যায়, সেখানেই একটা লোকাল এনজিও-র হয়ে কাজ করে দেবল। এই অঞ্চলের আশপাশেই থাকে। এ অঞ্চল বড় সুবিধের নয়, এক পাশে রাজমহল পাহাড় আরেক পাশে সীমান্ত, অপরাধের স্বর্গভূমি। দেবলের এসব গা সওয়া, ছোটবেলা থেকে সে দেখে আসছে, আর এ বিষয় নিয়ে ভাবার সময় কোথায় ছিল তার, বা তার মতো লোকেদের।

‘আরে তু নে তো ইস লোগো কো লে আয়া,’ সাদা শার্ট পড়া ফিরোজের গলায় সূর্যের আলো পড়ে মোটা বিছে হার চিকচিক করছে, ভাল করে তার কালো ভোঁতা মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না, দেবল তাও জানে না তাকিয়ে কথা বললে বিপদ, কোমরের কাছে যে ফোলা অংশটা রয়েছে, সেটা দিশি ওয়ান শটার নয়, অটোম্যাটিক, ‘হাম কেয়া নেহি কিয়া ইস হারামখোর...’ বলেই চলেছে ফিরোজ।

দেবল চুপচাপ তাকে চেঁচাতে দিল। সঙ্গের লোকটা কুতকুতে চোখে তাকিয়ে, সেই আসল মাতব্বর এই নাটকে, তার কথামতোই সব হবে দেবল জানে।

এইসব চেঁচামেচিতে বেশ কয়েকটা মেয়ে দাঁতে আঁচল দিয়ে ঘোমটা টেনে পিছতে পিছতে সরে গেছে, জমায়েত যারা করেছিল তাদের মধ্যে আর বেশি কেউ নেই, যে কটা ন্যাংটা বাচ্চা খেলে বেড়াচ্ছিল তারাও উধাও, একটু দূরে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আরেকটু বড় ছেলেগুলো মজা দেখছিল। বুড়ো সাজ্জাদ শুধু বসে, পাথরের মতো মুখ তার, অজস্র বলিরেখাময় আরো কুঁচকে গেছে এই থমথমে পরিবেশে, সাদা লম্বা দাড়ি হাওয়ায় উড়ছে, বয়সের ভারে কুঁজো হয়ে বসে, বিড়বিড় করছিল আপন মনে।

ডিরেক্টর সাহেব আড়চোখে একবার দেবলের দিকে তাকালেন, লোকটা তাকে কী সব বলে চলেছে ফরফর করে হিন্দি মেশানো একটা ভাষায় বোঝাও যাচ্ছে না। দেবলের মুখে চিন্তার একটা রেশ চোখে পড়ল কি?

তাঁর শুরুতেই একটু সন্দেহ লেগেছিল, এতদিন এ ধরনের কাজ করে একটা গাট ফিলিং তার আছে। প্রথমেই যখন এই জায়গাটায় এসে গাড়ি দাঁড়াল তখনই কেমন লাগছিল, পিচ রাস্তার থেকে ঢালু নেমে গিয়ে অনেকটা প্রথমেই একটা দোকান টাইপের বাড়ি মাথায় অ্যসবেস্টর্স-এর শেড, আশ্চর্য হল দোকানটার শাটার নামানো এবং কিসের দোকান বোঝা দুষ্কর। আশপাশে কোনো লোকজন নেই যেটা সাধারণত কোনো গ্রামে গেলে ঘটে না, বিশেষ করে একটা গাড়ি, ক্যামেরা ইত্যাদি দেখলে ভিড় বাড়ে, এখানে সেটা নেই, দূর থেকে কৌতূহলী চোখে শুধু কয়েকটি অল্প বয়সী ছেলে ছোকরা তাকিয়ে ছিল। আর ডিরেক্টর সাহেবের খালি মনে হচ্ছিল আরো অনেকগুলো অদৃশ্য চোখ যেন রয়েছে, তাদের দেখছে।

দেবল এমনিতে গায়ে পড়া অমায়িক ছেলে, কিন্তু গাড়ি থেকে নেমে সে দেখা গেল চুপচাপ, তাড়াহুড়োও করছিল একটু, তাদের কলোনির ভিতর না নিয়ে গিয়ে সামনে একটা ওই দোকানটা পেড়িয়ে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়াতে বলে চলে গিয়েছিল মেয়েদের জোগাড় করে আনতে। একটু পড়েই সে ফিরে আসে, সঙ্গে একটা পঁচিশ ছাব্বিশের যুবতী, চোখে পড়ার মতো। ঝলমলে বেগুনি রঙা শাড়ি কালো দোহারা শরীর বেয়ে উঠেছে, চোখা নাক চোখ, একটা ব্যক্তিত্ব রয়েছে। ‘আমার নাম সালমা,’ সে হাত জড় করে নমস্কার করে বলল, ‘ও এখানকার ফিল্ড ওয়ার্কার’ পাশ থেকে দেবল বলে উঠেছিল।

সেই সালমাই মেয়েদের জড় করেছে, সেই তাদের প্রায় হুকুম দিচ্ছিল কী বলতে হবে, কেউ মাঝখান থেকে কথা বললে চুপ করে উঠছিল। সালমার মতো মেয়েদের ডিরেক্টর সাহেব আগেও দেখেছেন। গাঁ গঞ্জে এই মেয়েরা কোনো এনজিও-র হয়ে কাজ করতে শুরু করলে দক্ষ হয়ে ওঠে ভীষণ তাড়াতাড়ি, শেখার এবং জানার আগ্রহ এদের প্রচুর, আর কাজ করার আগ্রহও এদের সাংঘাতিক। পড়াশোনা বেশি নেই, হয়তো কোনোরকমের স্কুলের গণ্ডি পেরিয়েছে বা কলেজ ড্রপ আউট কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে এদের মতো এফিশিয়েন্ট খুব কমই হয়, সরকারি দফতরে বা পঞ্চায়েত কর্মীদেরও এ দক্ষতা বিরল।

কি বলতে হবে এসব বোঝাতে বোঝাতে ক্যামেরার হোয়াইট ব্যাল্যান্স করতে করতে কিছুটা সময় লেগেছিল তাদের। দেবল মাঝখানে হঠাৎ বলে উঠল’ সালমাকে ছেড়ে দিতে হবে, ও পাশের গ্রামে যাবে ওখানে আরেকটা এমন একটা দল রয়েছে যারা কথা বলতে পারবে, ডিরেক্টর সাহেব ঘাড় নেড়ে সায় দেন। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই যখন সবে ক্যামেরা অন করা হয়েছে বাইক আরোহী দুই যমদূত হাজির। আদৌ শুটিংটা করা যাবে কি না সেটাই বোঝা যাচ্ছে না এখন।

‘এরা এই অঞ্চলটা দাবিয়ে রেখেছে, দেখেছেন কেমন করে কথা বলে কলোনির মানুষজনের সঙ্গে’ দেবল ফিসফিস করে বলল। বাইক নিয়ে আবার খিস্তি করতে করতে ফিরোজরা চলে গেছে তখনকার মতো, কলোনির মধ্যে দিয়ে। ভুরু কুঁচকে ডিরেক্টর সাহেব জানালেন ‘দেখো ভাই আমরা এখানে কাজ করতে এসেছি, ঝামেলায় পড়তে নয়। এখানকার ব্যাপারটা তুমি তো আগে কিছুই বলনি।’

‘কি আর বলব স্যার বুঝছেনই তো, এখানে কাজ-কারবার কিছুই নেই, ছেলেপুলেদের দিয়ে ভুলভাল কাজ করায় এরা।’

‘তো কি করা যাবে আমরা তো ক্রাইমের উপর ডকু করছি না, করছি মেয়েদের উপর।’

‘স্যার এসব অঞ্চলে কিচ্ছু উপায় নেই সব বিহারি মুসলমান, এরা বদলাবে না, এসবই করবে।’

‘দ্যাখো আমার মনে হয় এখানে যত তাড়াতাড়ি হয় শুট করে পাশের গ্রামে চলে যাওয়া ভাল।’

‘তাই করুন স্যার’ বলে দেবল সরে গেল কিছুটা। ডিরেক্টর সাহেব সহকারীর দিকে তাকিয়ে বললেন ‘ক্যামেরা চালু করতে বল।‘ মুখ শুকিয়ে গিয়েছে সহকারীর পেটের ভিতর যেন আবার মুচড়চ্ছিল, সে ব্যাজার মুখে এগিয়ে গেল ক্যামেরাম্যানের দিকে।

ক্যামেরাটি আবার চালু হল, একটা ঠাণ্ডা চোখ যেন অনন্তের জন্য তুলে নিচ্ছে কিছু ছবি যার কোনো আবেগ, অনুভূতি কিছু নেই। কী দেখছিল সে ক্যামেরা? তার পঞ্চাশ মিমি স্ট্যান্ডার্ড লেন্স-এ দু চারটে মেয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা, প্রায় ফিসফিসের স্বর, কোনো কথার কোনো মানে নেই কারণ কি বলবে তারা যদি বা জানত আগে, এখন এই ঘটনার পর তা সম্পূর্ণ গুলিয়ে গেছে। ক্যামেরা অন করে ক্যামেরাম্যান ভিউইং স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে নিয়েছিল, সে দেখছিল জটলার পিছন দিকে আঁকাবাঁকা একটা রাস্তা চলে গেছে, কয়েকটা বাড়ির আঙিনা ধরে, বাড়িগুলো সবই অস্থায়ী মাটি আর দরমার তৈরি, বড় বড় আম গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ পড়েছে তাদের উপর, চৌখুপি তৈরি করেছে আলো আঁধারির। দূরে রাস্তাটা যেখানে বড় রাস্তায় মিশেছে সেখানে দেখা যাচ্ছে বাইকটা দাঁড়িয়ে রয়েছে, দূর থেকে তারা নজর রাখছে।

দেবল একটু সরে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। একটা রুমাল বের করে সে ঘাম মুছে পাশে এসে দাঁড়াল সহকারী পরিচালকের। বত্রিশ তেত্রিশ-এর ছেলেটা রোগাটে বেঁটেখাটো চেহারা, মুখ ব্যাজার, মাঝে মধ্যেই সে বাদামী জ্যাকেটের মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে বুক ডলছিল, আর ঢেকুর তুলছিল।

‘দাদা, জানেন তো এখানে কি হয়’ দেবল তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, সে ফিরে তাকাল দেবলের দিকে জিজ্ঞাসু চোখে, ‘ আরে এরা সব মাফিয়া এখানকার, একটু বেচাল দেখলে কোথায় যে কাকে লোপাট করে দেবে কেউ জানে না’

‘কী করে এরা?’

‘আরে দাদা এক সব রকম ক্রাইম করে, খুন জখম পাচার। এদের হাত চারদিকে, আগে পঞ্চায়েতে প্রধানের হয়ে কাজ করত এরা, এখন এদের ভাইয়েদের একজন দাঁড়িয়ে গেছে পঞ্চায়েত ভোটে, ফলে একটা ঝামেলা লেগে রয়েছে’ দেবল পকেটে হাত ঢুকিয়ে হেসে হেসে বলছিল, ‘ডিরেক্টর সাহেব রেগে যাচ্ছেন, কিন্তু আমাকে ছাড়া এখান থেকে আপনারা কাজ করে বেরতে পারতেন না’

দেবলের কথায় সহকারীর অবস্থা শোচনীয়, এ কোন বিজন বিভুয়ে এসে পড়া গেলরে বাবা, কি ছাতার ডকুমেন্টারির চক্করে, এখন মানে মানে বেঁচে ফিরলে হয়। যে জায়গাটা তার এক দের ঘণ্টা আগেও মনে হচ্ছিল পরম রমণীয়, আম গাছের বিশাল বাগান, ঘাসের কার্পেট মোরা নরম মাটি, হাঁটতে হাঁটতে তার ছোটবেলার পিকনিক মনে পড়ছিল, আর ছোট-ক্লাসে পড়া কবিতা বুক ভরা মধু বাংলার ইত্যাদি ইত্যাদি নিমেষে সে ধারণা বদলে গিয়েছে। এখন এটা অত্যন্ত বদমায়েশ কিছু গ্রামের ডাকাত, খুনেদের আস্তানা, গ্রামের মানুষ যে কত পাজি হয় সে কি আর তার জানা নেই, ‘আরে এরা আমাদের ভয় দেখাচ্ছে মাত্র’ সে হেসে বলার চেষ্টা করল, গলাটা যদিও খুবই ফ্যাসফ্যাসে শোনাল, তবুও সে স্মার্ট হওয়ার চেষ্টা করে।

‘আমি যখন প্রথম এখানে কাজ করতে ঢুকি এদের সঙ্গে যা গেছে না, আমাদের কলকাতা থেকে লোক এসেছিল, তাদের গাড়ি আটকে রাখে, টায়ার পাংচার করে দেয়। সে সব কি ঝামেলা গেছে। তবে এখন অনেকটা বুঝিয়ে কাজ করতে পেরেছি, বন্যায় ভেসে যাওয়ার পর তেরপলের তাঁবু, খাবার সাপ্লাইয়ের কাজ, এসব করতে অনেক সময় গেছে, এখানে আসলে পড়ে না থাকলে কাজ করা যায় না দাদা।’

সহকারী যে খুব মন দিয়ে দেবলের কথা শুনছিল তা নয়, সে চাইছে যত তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে এখান থেকে পাত্তাড়ি গোটাতে। ডিরেক্টর সাহেবের দিকে সে তাকাল, কাঁচা পাকা দাড়ির লোকটা চেষ্টা করে চলেছে, যে ক’জন রয়েছে তাদের নানা প্রশ্ন করছে, যদিও উত্তর তেমন কিছু দিতে পারছে না তারা, যা বলছে তা দিয়ে কাজ হবে না।

‘সালমা মেয়েটা কে?’

‘ও এখানকারই মেয়ে, এদের মধ্যে থেকে ভাল কাজ করছে’ দেবল এই বলে অন্য কথায় চলে গেল দ্রুত, ‘আপনাদের এখানকার কাজ ঠিক করে করে দিয়ে তবে আমি বেরব, চিন্তা করবেন না আমি আছি তো।’

দেবলের কথায় খুব বেশি কাজ হল বলে মনে হল না, সহকারীর মুখ এখনও ব্যাজার। সে টুকটুক করে এগিয়ে গেল ক্যামেরাম্যানের পাশে, যে নিজের মনে শট নিয়ে চলেছে এখন, বার বার ফ্রেম ঠিক করছে চেষ্টা করেছে চলেছে কাজটায় সামঞ্জস্য বিধানের, যদিও ডিরেক্টর সাহেব বুঝতে পারছিলেন এ কাজের কোনো মানে নেই, পণ্ডশ্রম হচ্ছে।

‘স্যার এখানে আর বেশিক্ষণ থাকাটা ঠিক হবে কি?’

‘কেন?’

‘না মানে, এই আর কি?, আমার আবার পেটটা কেমন..’

ডিরেক্টর অন্য সময় হলে রেগে যেতেন, কিন্তু এখানে তিনি জানেন সত্যি কিছু কাজ হচ্ছে না, খামোখা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছু না, কিন্তু কিছু একটা শুটিং করা দরকার তো এখানে, না হলে টাকাটাই জলে যাবে। যদিও তিনি ক্রমশ বুঝতে পারছিলেন পণ্ডশ্রম হচ্ছে, তাঁর স্বাভাবিক বুদ্ধি বলে যে পুরো প্যাক আপ করে চলে যাওয়াই ভাল। তবুও তিনি আরো একটু দেখতে চান, একটা রোখ চেপে গেছে, যদিও তা নিছক ব্যক্তিগত কৌতূহল। সঙ্গে একটা প্রফেশনাল সততাও মিশে আছে কি?

তিনি দেবলকে ডাকলেন, ‘শোনো এখনে আর কিছু হবার নেই, তুমি বরং ওই আরেকটা জায়গা বলছিলে সেখানে চল এবার।’

ক্যামেরা বন্ধ হয়ে গিয়েছে, চারদিক হঠাৎ খুব শান্ত নিস্তরঙ্গ, বুড়ো সাজ্জাদ হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ম্যা নে বোলা থা কেয়া হো রাহা হ্যায়, আপনেরা একটু খাড়ান, এই নাজমা, হেই বিটিয়া কেয়া বোলনা হ্যায়..

সাজ্জাদকে ধমক দিয়ে প্রায় থামিয়ে দিল দেবল, আরে এই চাচা এদের কাজ আছে অনেক, যা জানার জেনে নিয়েছেন এরা,’ দেবলের কথায় বাকিরা অপ্রস্তুত, সাজ্জাদও একটু থতমত খেয়ে চুপ, বিড়বিড় করে আবার কি বলল। অসংলগ্ন কথাগুলো বোঝা গেল না।

সাজ্জাদ সকালবেলা উঠে থেকে নাজমা তার ছেলের বউকে বোঝাচ্ছিল যে তাদের সব সমস্যার কথা বলতে। সাজ্জাদের অবস্থা সঙ্গিন, তার ছেলে ভিন রাজ্যে চলে গেছে কাজ করতে এই কলোনির বেশির ভাগ ছেলেরাই এক যারা ওই বদমায়েশগুলোর পাল্লায় পড়েনি। না গেলেই বা করত কি, সাজ্জাদ জানে উপায় নেই, বছর চল্লিশ ধরে এ জায়গায় রয়েছে তারা কোনো পাট্টা পায়নি জমির, মালিকানা নেই কিছুর, তার উপর নানা লোকেদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। একে কি বাঁচা বলে। এখানে সরকার বলে কিছু নেই, আইন কানুন নেই, স্রেফ তোলাবাজি, জোর যার মুলুক তার।

সাজ্জাদ সমস্যায় পড়েছে তার ছেলের বউ আর তার তিন নাতনি আর এক নাতিকে নিয়ে। দু’বেলা মুখে ভাত জোটাতে হিমশিম অবস্থা, তার মধ্যে বড় নাতনিটার উপর নজর পড়েছে, কোনদিন পাচার করে দেবে ঠিক নেই। কে বলবে তাদের কথা, গত রাতে সালমা এসে যখন বলে শহর থেকে লোক আসছে তাদের উপর কি একটা টিভির কাজ হবে তখন সাহস পেয়েছিল। এরা যত আসবে তত একটু ভরসা পাওয়া যাবে, সে নাজমাকে, কলোনির মেয়েদের বোঝাচ্ছিল, সব কথা বলতে। এতে তার বিপদ হতে পারে জানত, কিন্তু বয়স তো আর কম হল না, এখন আল্লার নামে কয়েকটা দিন কাটানো।

সন্ধ্যের দিকে লুকিয়ে এসেছিল সালমা, সে মেয়েদের সঙ্গে কথা বলবে বলে সাজ্জাদকে বলে, বয়স্ক লোকটার কথায় সবাই একটু ভরসা পায়, না হলে চটকরে এই কলোনির মেয়েরা কারো সামনে বেরোয় না, বিশেষ করে পাশের দুটো গ্রামের কারো সমানে তো বটেই। এই গ্রাম দুটোর লোকজনদের তো তারা আজ দেখছে না, বহুদিন ধরেই তাদের কিভাবে ব্যবহার করছে সেই দুই গ্রামের কিছুটা সচ্ছল বাসিন্দারা, জন খাটিয়ে পয়সা মেরে দেওয়া থেকে শুরু করে অত্যাচারের শেষ নেই।

সালমা এসে হ্যারিকেনের আলোয় বসেছে, গ্রামের কয়েকটা মেয়েকে নিয়ে, তাকে দেবল বুঝিয়ে দিয়েছে, কি বলতে হবে। সন্ধ্যের আধো অন্ধকারে ফিসফিস করে সে বোঝাচ্ছিল, ‘শোনো কাল কলকাতা থেকে আসছেন যারা তাদের কাছে তোমাদের কথা বলবে, কিভাবে এরা ঝুটমুট বলে তোমাদের কাজ করিয়ে নেয়, তোমাদের জমি নেই, বাড়ি নেই কিচ্ছু নেই’

একথা শুনে মেয়েরা চুপ। সাজ্জাদের দিকে তাকাল সালমা, সাজ্জাদ না বললে এরা ভরসা পাবে না। বুড়ো সাজ্জাদ এদের ধমকে ধামকে বোঝাতে শুরু করে, যদিও এই মেয়েরা কারো সামনে বেরই হয় না, বেরনোর সাহসই বা পাবে কোথায়, আখলাকদের ভয়ে এরা কাঁটা হয়ে থাকে। না হয়ে উপায়ও তো নেই, নেতা, সরকারিবাবুরা, পুলিস সবাই এদের হাতে তামাক খায়। সবই তো জানা, কে আর জেনে বুঝে ঝামেলায় পড়ে। তবুও সাজ্জাদ বলছে যখন, সালমা বলছে যখন, কিছু একটা হয়তো সুরাহা হতে পারে কাল।

কলোনির থেকে গাড়ি বেরনোর পর, একটু নিশ্চিন্ত হল সহকারী, যাক বাঁচা গেছে, দেবলটা চলেছে সামনে একটা সাইকেলে চেপে, উঁচু একটা বাঁধের উপর দিয়ে এবড়ো খেবড়ো রাস্তা। এক পাশে পরের পর বড় জলাশয়, নদীর পথ বদলের ফলে তৈরি হয়েছে স্বাভাবিক নিয়মে, টলটলে জল বেশিক্ষণ তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, ঘুমঘোর তৈরি হয়। শাদা অ্যাম্বাসেডর ধুলোয় প্রায় মেটে রঙের হয়ে গেছে, সহকারী মুখ বের করে দেখল, অনেকটা নিচে ঢালু হয়ে নেমে যাওয়া ঘাসে প্রান্তর দিয়ে বাইকটা তাদের পিছনে পিছনে আসছে। সামনে দেবল ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছে কারণ, এই রাস্তায় সাইকেল চালানো যায় গাড়ি নয়।

একটা বড় গাড্ডা। গাড়ি দাঁড়াতে বাধ্য হল। ডিরেক্টর সাহেব-এর মুখ গম্ভীর, ‘ফোন কর দেবলকে।’ একথা শুনে সে আর না বলে পারল না ‘এই, এই রাস্তায় স্যার আর যাওয়া যাবে না। গাড়ি যদি উল্টে যায়? আর শুট করেই বা কি হবে আর অনেক তো স্টক নেওয়া আছে।’

ডিরেক্টর কোনো উত্তর দিলেন না। ব্যাজার মুখে সহকারী ফোনে বাটন টিপতে টিপতে এগিয়ে গেল, গিয়েই থতমত, নযস্থৌ... সামনেই সেই বাইক থেকে নেমে আসছে আখলাক আর ফিরোজ। সহকারীর মুখ আমশি, মনে পড়ে গেল দেবল বলেছিল, এরা এখানে যা ইচ্ছে করতে পারে। ডিরেক্টর সাহেবও গাড়ি থেকে নেমে পড়েছেন, সঙ্গে ক্যামেরা ম্যান।

‘আপ লোক ডরিয়ে মাত ইয়ে গাড্ডা কে বাদ কওই দিক্কত না হবে, রাস্তা দুরস্ত হ্যায়,’ হেসে বলল ফিরোজ। একথা সহকারীকে বলে সে ডিরেক্টর সাহেবের দিকে তাকাল’ হামারি বাত সে বুড়া মাত মানিয়ে, আপ সে কোই দুশমনি নেই। কিন্তু ওই হারামিটা দেবল, নিচু জাতের লোক এখানে সব কো ভড়কাচ্ছে। আমার এই দাদাকে দেখছেন ওর দাদা এখানকার লিডার আছে। পঞ্চায়েত হামারা হ্যায়। লেকিন ও সালমা রেন্ডি কি বুলব হামারা চাচাতো বহেন, দেবলের সঙ্গে মিশছে। ভড়কাচ্ছে আনপরদের’

‘সালমা তোমাদের বোন?’ ডিরেক্টর অবাক।

আখলাক এতক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল, জরিপ করছিল এই শহর থেকে আসা দলটাকে। এবার এগিয়ে এসে থামাল ফিরোজকে, আরে র‍্যাহেন দো, আপলোগ ছাড়ুন ওসব। আপ জরুর ইহা আইয়ে,’ তারপর নাটকীয়ভাবে বাঁপাশের জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে বলল ইয়ে ঝিল হামারা হ্যায়, আম কে বাগিচা হ্যায় থোরি দূর। আপ কো যো চাহিয়ে মিলেগা, আপ হামে খবর করকে আ যাইয়ে যবভি ইয়াদ পরে।’

এই কথার মাঝখানে দেবল এসে হাজির, তাকে দেখেই ফিরোজ খিস্তি মারতে যাচ্ছিল, আখলাক থামাল। সহকারী ভাবছিল, এই বুঝি একটা খুনোখুনি শুরু হবে, কিছুই হল না। বরং আখলাক তাদের বলল, ‘আপ যাইয়ে উধার, রাস্তা এরপর আর খারাব নয় খুব।’ সহকারী এ কথা শুনে তাকাল ডিরেক্টর-এর দিকে, তিনিও রাজি যেতে, খুঁটিনাটি জিজ্ঞেস করছিলেন তাদেরই। দেবলের মুখ ভার সেই জন্যই কি?

দেবলকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত শুটিং পার্টি পৌঁছল গ্রামে। দেবল আর আগের মতো কথা বলছে না। তার ঘুঁটি কেঁচে গেল কি? সে অনেক পরিকল্পনা করে এদের নিয়ে এসেছিল, অনেকদিন ধরে এই বারো ভাইয়ের অত্যাচার সহ্য করেছে এখানকার লোক, সে যখন প্রথম কাজ করতে আসে, বিদেশি ফান্ড-এর তাকায় বন্যার পর রিহ্যাবিলিটিশন প্রজেক্ট কম গঞ্জনা তাকে সহ্য করতে হয়েছে। সে নিচু জাতের হিন্দু, সেই জন্য তাকে তাকে একটা বিচ্ছিরি নামে ডাকা হয় এখানে, যদিও এরা মুসলমান তবু তাকে নিচু জাতের বলে পছন্দ করে না। অথচ সে আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এখানে কাজ যাতে ঠিকমতো হয়, ঘাড় মুখ গুঁজে পড়ে থেকেছে তেরপল বাঁশ বিলির কাজে সে যা খেটেছে আর কেউ খেটেছে কি। আর কেউ পাড়ত কি?

দেবলের একটা অন্য ব্যবসাও আছে চীনে ইলেকট্রনিক, প্লাস্টিক জিনিসের ব্যবসা, টানা মাল আসলে, সে বাধ্য হয়েই এই ব্যবসা শুরু করে, না হলে টিকতে পারত না, ফান্ডের বাবুদের ইচ্ছে অনিচ্ছার উপর তো ভরসা করতে সে পারেনি, কলেজ পাস করে সে যখন এই কাজে ঢোকে তার কিছুদিনের মধ্যেই বুঝে যায় এসব বিষয়। তাই ব্যবসাটা সে ভালই চালিয়ে নিয়ে গেছে।

তাই যখন দেবলের এখানে কাজ করতে করতে যখন প্রায় অসহ্য হয়ে উঠেছে, ওর লোকজন মার খেয়েছে আখলাকদের কাছে, যখন ও নিজেও যথেষ্ট হেনস্থা হয়েছে তখন ভেবেছিল ছেড়ে দেবে। সে যতই নতুন প্রজেক্ট ঢুকুক না কেন, আর না। এমন সময় সালমা তার সঙ্গে দেখা করে।

সালমা যে ওই বারো ভাইয়ের বোন তা সে জানত। তার বরকে ছেড়ে সে চলে এসেছে, এখন বাপের কাছে থাকে, সেটা সত্যেও খুব হুলুস্থুলুস হয়নি কারণ ওদের পরিবারের প্রতাপ। তবে তার চাচাতো ভাইয়েরা মনে মনে একটু রুষ্টই হয়েছিল। সানে না হোক পিছবে তো এ নিয়ে লোকে তামাশা করবেই। ওদের ইজ্জতের কি হবে?

সালমা কিন্তু তেজি ঘোরার মতো, সে স্বামীকে ছেড়েছে, এমনি এমনি না, নিজের জন্য কিছু করতে চায়। আর তার জন্য দেবলকে তার দরকার।

‘আমাকে?’ প্রশ্ন করেছিল দেবল, সে জানে তাকে ওর পরিবারের লোকজন সুনজরে দেখে না।

সালমা কিন্তু কোনো রকম উষ্মা দেখায়নি, সে বিনয়ের সঙ্গে বলেছিল এনজিও-র কাজ করতে চায়। সালমাকে পেয়ে যাওয়ায় তার সুবিধে হল। এবং আস্তে আস্তে বুঝল যে এবার তার সময় আসছে, ক্ষমতার উৎস বদলাচ্ছে এবং সে ঠিক দিকেই আছে। শুধু বুদ্ধি করে কব্জা করতে হবে।

দেবলের মতো সালমাকেও শুরুতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। ফিরোজ ওকে চুলের মুঠি ধরে মেরেছিল কয়েকবার, অন্য আরেক ভাই যে পঞ্চায়েতে গেছে সে ওখানে ওর ঢোকা বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এখনোতো কলোনির মেয়দের সঙ্গে সে প্রকাশ্যে কথা বলতে পারে না। কিন্তু ও ঠিক নিজের মতো করে সমর্থন তৈরি করেছে, এনজিও কাজের অছিলায় তার নিজের দিকেও এখন কম লোক নেই। দেবলের মতো সেও বুঝেছে এটাই সুযোগ। এনজিও-র লোকজন দেখতে চায় না কি হচ্ছে কিভাবে কাজ হচ্ছে, সব শেষে একটা রিপোর্ট পেলেই খুশ। একটা গোছানো, মোটাসোটা, হিসেব মেলানো রিপোর্ট ব্যাস পুরো রাজত্বি তোমার। একথা বুঝতে বেশিদিন টেম নেয়নি, সালমা।

গ্রামের ভিতর তখন প্রচুর লোক। মেয়ে, পুরুষ, অ্যন্ডা বাচ্চা, দোকানি, চাষি, মৌলবি সবাই জড়ো হয়েছে। সালমা তাদের মধ্যেই রয়েছে। সবাই কথা বলছে, একটা হট্টগোল ডিরেক্টর সাহেব গাড়ি থেকে নামার আগেই বুঝলেন যা হওয়ার হয়ে গেছে, তাঁর কাজ কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না, তবুও এই অবস্থায় ক্যামেরা না খুললে আরো অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হবে।

ক্যামেরা ম্যান তার নির্দেশে ছবি তুলে চলেছে, এদিকে দেবল নতুন উৎসাহে সবাইকে বলে চলেছে কি বিশাল ফাঁড়ার মধ্যে দিয়ে তারা এসেছেন, শুধু গ্রামের মেয়েদের জন্য, সাধারণ মানুষের জন্য।

‘আপনারাই দেখুন কি অবস্থা, কি করে কাজ করা যায় বলুন তো?’

দেবলের এই কথায় লোকজন ফুঁসে উঠল, ঠিকই তো, এই ভাইয়েরা পুরো অঞ্চল কব্জা করে রেখেছে। সালমা মেয়েদের বলছে তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা বলতে, যে লোকজন এখানে এসেছে তারা গ্রামেরই লোক যদিও, কলোনির কেউই নেই। এবং যারা এতো ফুঁসছে, যারা বিহিত করতে আগ্রহী তাদের চেহারা দেখে মনে হয় কিছুটা স্বচ্ছল, এবং কলোনির লোকেদের মতো একেবারেই যে তাদের অবস্থা নয় তা একটু নজর করলেই বোঝা যায়।

সালমা ও দেবল এই কলকাতা থেকে আসা লোকেদের সাক্ষী রেখে বলল যদি গ্রামের লোকেরা তাদের সঙ্গে থাকে তো বিডিও অফিসে যাবে, এর একটা বিহিত করে ছাড়বে। সঙ্গের লোকেরাও বেশ উৎসাহ দিল। যেমন হয়, সামনে কয়েকজন চেঁচাচ্ছে দেবল আর সালমাকে কেন্দ্র করে আর পিছনে আরো বেশ কিছু লোক পোঁ ধরছে। তারও পিছনে কিছু কৌতূহলী লোকজন দেখছে, শুনছে হাসছে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে।

কারসাজিটা স্পষ্ট হচ্ছে ডিরেক্টরের কাছে, কিন্তু ফাঁদে তারা পা দিয়ে ফেলেছেন। দেবলকে এরই মধ্যে ডিরেক্টর সাহেব এক পাশে ডাকলেন ‘শোনো দেবল আমরা কিন্তু এখানে অন্য কাজে এসেছিলাম, মেয়েদের অবস্থা কী সেটা জানতে, লোককে উসকোতে নয়...’

‘কী করব স্যার দেখলেনই তো এরা কি করল, লোকজন রেগে উঠেছে বুঝতেই তো পারছেন, আমি কি করব বলুন, আমায় তো এদের নিবেই কাজ করতে হয়।’

‘সালমাকে বোঝাও আমারা কেন এসেছি।’

‘আমি চেষ্টা করছি স্যার।’

দেবল জটলা থেকে সরিয়ে নিয়ে গেল সালমাকে। যদিও কিছু অদলবদল দেখা গেল না। ডিরেক্টরসাহেব এবার নৈর্বক্তিক, সত্যিই তার কাজটা হল না, তার চোখ এখন আশপাশের মাটির বাড়ি, খড়ের ছাদ, কয়েকটা পাকা বাড়ি মাথায় অ্যাসবস্টর্সের ছাউনি, পেড়িয়ে গাছ গাছালির ফাঁক দিয়ে আমবাগানে। দূরের ওই বাগানগুলো যেন শেষ নেই, কবেকার কাল থেকে রয়েছে যেন, নিশ্চুপ শুধু দেখে চলেছে।

দেবল ও সালমা এক সঙ্গে একটা ফন্দী এঁটেছে তিনি বুঝতে পেরেছেন ক্ষমতার দখলের একটা লড়াই চলছে স্পষ্ট। হঠাৎ তাঁর মনে হল এই সেই অঞ্চল, এখান থেকে সুবে বাংলার রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হত। রাজধানীও ছিল এখানে। ইতিহাসের স্রোতে কেন্দ্র বদলে যায়, তবু থিতনো জলও কি পড়ে থাকে কিছু? রক্তে মিশে রয়ে যায়? খেলার গণ্ডিটা কুঁচকে ছোট গেছে হয়তো, কিন্তু এখনো রয়েছে সেই রাজনীতির মারপ্যাঁচ, সেই ক্ষমতার জন্য লড়াই। এবং এটা যাবে না কখনওই। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন তিনি, কাজ পণ্ড হওয়ায় আরো বেশি ক্লান্ত লাগছে এখন।

পাশে দাঁড়ানো সহকারীকে বিড়বিড় করে বললেন, ‘দ্যাখ এই হচ্ছে অবস্থা, আর কলকাতায় সবাই ভাবে দাদা আর করেটা কি, গ্রামে যায় আরামে ঘুরে বেড়ায়, শুট করে চলে আসে।’

সহকারীর মুখ চুন তখন, ‘ফিরে গেলে হত না স্যার?’

‘কেন রে? খিদে পেয়েছে?’

‘না স্যার একটু পেয়ে গেছে, দেবলটা খুব হারামি বললাম কারো বাড়িতে ব্যবস্থা করতে বলল সবাই এখানে মাঠে ঘাটে যায়,’ এই বদমায়েশিতে সে প্রচণ্ড চটেছে, মনে মনে শাপ শাপান্ত করছে, ডিরেক্টর সাহেবের তবুও হাসি পেল। সত্যি কি এসে যায় তার সহকারীর? সে কন্ট্রাক্টে এসেছে, সিনেমা নিয়ে তার মাথাব্যথাও নেই, খুব যে কাজ জানে তাও নয়। সন্ধ্যে হতে আর বেশি দেরিও নেই। খামোখা এখানে অপেক্ষা করার মানে হয় না গুটিয়ে নিয়ে জেলা সদরে ফিরে যাওয়া যুক্তিযুক্ত। তবুও একটা রোখ চেপেছে সালমাকে প্রশ্ন করার। কৌতূহল, মেয়েটা কেন ভায়েদের বিপক্ষে গিয়ে এই খেলায় মেতেছে?

দেবল গ্রামের লোকেদের বুঝিয়ে ফেলেছে কি করতে হবে। সালমাকে সে বোঝাচ্ছিল, বিডিও অফিসে একটা ডেপুটেশন দিতে হবে, সে লিখে দেবে, সালমা গ্রামের লোকেদের নিয়ে যাবে। ‘বিডিও সাহেব তো চেনাই, আমাদের ওঁর দরকারও আছে, সরকারি লোককেও তো কাজ দেখাতে হয়’ দেবলের এ ব্যাপারে মাথা পরিষ্কার, বিডিও-কে পটিয়ে প্রশাসনিক সাহায্য নিয়েই পঞ্চায়েতে জমিয়ে বসতে হবে।

‘ভাইয়েদের কথায় কি মনে হল?’ সালমা প্রশ্ন করে

‘বহুত ভাও নিচ্ছিল, তবে আসলে ভয় পেয়েছে, বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে’

‘সেটাই ভাল, চুপচাপ কাজটা করে ফেলতে হবে’ সালমার এই কথার সঙ্গে সে একমত। দেবলের উদ্দেশ্য নয় সালমার চাচাতো ভাইদের সঙ্গে খামোখা লড়াইয়ে যাওয়া। সে শুধু চায় ক্ষমতার ভাগ পেতে, এনজিও, প্রশাসন সব মিলিয়ে সে দেখেছে নতুন একটা ক্ষমতার ও টাকার উৎস তৈরি হয়েছে, এখানে এরাই মুখ্য। তাই যদি হয় তাহলে আখলাকদের জায়গায় সে বা সালমা কেন নয়।

আখলাকরা সত্যিই বুঝতে পারছে না দেবল কি চায়, যতদিন না বোঝে ততদিন ভাল, কারণ শুধু ভোট রাজনীতিকে বন্দুক দিয়ে সাহায্য করে নয়, আরো অন্যভাবে জমিয়ে বসতে হবে। আর সেটা এই এনজিও, নানা স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এগুলোই নতুন পথ। টাকা পয়সা গাঁ গঞ্জে ঢুকছে এদেরই হাত ধরে, সরকার নিজে থেকে কিছু করতে চায় না এদের দিবেই কাজ করাতে চায়। এরাও সেটা বুঝে নিজেদের মতো খবরদারি শুরু করেছে, এক একটা এনজিও একেকটা জোঁক। তার সুযোগ এখনি নিতে হবে।

দেবল দেখল ডিরেক্টর তাকে ডাকছেন, সে যেতেই তাকে বললেন ‘কি হল, সালমাকে বল একটা ইন্টারভিউ দিতে, আমাদের এখানে তো আর কিছু কাজ নেই?’

সে সন্তর্পণে বলল, ‘স্যার তার আগে একটু যদি এ বিষয়ে আপনি কিছু বলেন এদের’

‘এদের আমি আর কি বলব বলো’ ডিরেক্টর বুঝতে পারছে তাকে দেখিয়ে এখানে শুধুমুধু ঝামেলাটা পাকানোর চেষ্টা করছে, এখন তিনি জানতে চান এই মেয়েটার সঙ্গে কথা বলে, যদি বোঝা যায় কেন এই মেয়েটাও এতে যোগ দিল। শুধু এনজিও-র কাজই তো সে করতে পারত, এখানেও কেন সেই একই ক্ষমতার গল্প চলে আসছে।

এ রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব নয়। দেবল বুঝে গেছে একা ছাড়া যাবে না সালমাকে ডিরেক্টরের ক্যামেরার সামনে, সে কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয়, ‘ও খুব ভয় পেয়ে গেছে স্যার আপনি আমায় বলুন কি প্রশ্ন করবেন আমি ওকে বলছি বলতে, না হলে কিছু বলতেই পারবে না, গ্রামের মেয়ে স্যার।’

ডিরেক্টর তাকালেন দেবলের দিকে, বেশ কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকলেন। একে জব্দ করা যাবে না। একটা হাই তুলে বললেন, ‘ যা ভালো বোঝো। আমি প্যাক আপ করে দিচ্ছি,’ বলে সহকারীকে হাত নেড়ে ঈশারা করলেন। ডিরেক্টরেরও আর ভাল লাগছে না। তিনিও কোনো অ্যাক্টিভিস্ট নন বা ঝাণ্ডাওয়ালা, স্রেফ নিজের কৌতূহলে এখানে ছিলেন, নাহলে কখনই প্যাক করে চলে যেতেন। তিনি এসবের মধ্যে একদমই ঢুকবেন না সত্যিটা ধরতে পারলেও।

সালমা, দেবলরা খুব একতা পাত্তাই দিল না, তাদের কাজ হয়ে গেছে। এখন এইসব লোকজনকে নিয়ে একটা ভাল মতো ফ্যাঁকড়া বাধানো যাবে। চাইকি পঞ্চায়েত থেকে ওই ভাইটাকেও সরানো যেতে পারে বা তাকে সন্ধি করতে বাধ্য করা।

গাড়ি ফিরছে সেই রাস্তা দিয়ে, লাল রঙের সূর্য ঠিক ওই কলোনিটার মাথায়, রক্তচক্ষু নয় বরং নিষ্প্রভ, দূরে দেখতে পেলেন বুড়ো সাজ্জাদ বসে রয়েছে হাঁটু মুড়ে, দু’হাঁটুর মাঝখানে একটা বাঁশের লাঠি। অশ্লীলতম দৃশ্য এটা, যদিও গ্রামের এই প্রেক্ষাপটে একটা অতি স্নিগ্ধ দৃশ্য হতে পারত। শান্ত সবুজ অপরাহ্ণে এক বৃদ্ধ বসে রয়েছে সমাহত , এমন মনে করা যেতেই পারত। কিন্তু তা সত্যি নয়। দৃশ্যটা আসলে অশ্লীল – ডিরেক্টর, দেবল, আখলাক, সালমাদের বারো ভূতের বাজারে।