গল্প : দেবাঞ্জন দাস

জনিদের বৃষ্টি

বৃষ্টি আজ থাক, জনি খেলবে

তুমি অন্য একদিন এসো ...

রাত হয়েছে। সাতদিন বাড়িতে মাছ নেই। কুটু ভাত খেতে চাইছে না। লম্বা বারান্দা। বারান্দার একদিকে সিঁড়ি। অন্যদিকে স্টাডি। স্টাডিতে একটা কম্পিউটার। দুটো বুক র‍্যাক। বুক র‍্যাকের উপর পুরনো বাক্স। ঠিক তার বাইরে ব্যালকনিটা ঝুপ করে বেল গাছের বুকে গিয়ে পড়েছে।

ঐ বেলগাছে ব্রহ্মদৈত্য থাকে।

না একা বুড়ি থাকে।

একা বুড়ি!

হ্যাঁ একা বুড়ি।

আচ্ছা একা বুড়ি ...

কি ঠিক আছে?

দেখুন, ব্রহ্মদৈত্য বা একাবুড়ি – এই দুটোর মধ্যে আমার কোন প্রেফারেন্স অফ চয়েস নেই। ব্রহ্মদৈত্য থাকলেও গল্প হয়, একাবুড়ি থাকলেও গল্প হয়। ব্রহ্মদৈত্য ভালো ভুত, একাবুড়ি খারাপ ভুত...

হতেই পারে.. গল্পের কি যায় আসে ? না, গোপাল-রাখাল দ্বন্দ্ব সমাস এস্টাবলিশ বা এক্সপ্লেন করার কোন দায় আমার নেই ...

সে না থাকতেও পারে .. কিন্তু একাবুড়ি আর ব্রহ্মদৈত্যকে আর্কিটাইপ বলে তো মানবেন ... আর সেক্ষেত্রে গোপাল-রাখাল দাঁত ক্যালাতে ক্যালাতে এন্ট্রি নেবেই ...

আহা! That is agreed ... but যদি গোপাল ও রাখালের পয়েন্ট অফ এক্সটেন্ডেড রিয়েলিটিতে ব্রহ্মদৈত্য ও একাবুড়িকে না রাখা হয় .. যদি এন্টায়ার ‘রিয়েল’-কেই চেঞ্জ করে দেওয়া হয় ...

আচ্ছা! .. আপনি বলতে চাইছেন .. fantasy is nothing but a different reality …

Yes …

তাহলে এটাকে কি একটা ক্লজ হিসেবে রাখব ?

রাখতেই পারেন .. আমার কোন আপত্তি নেই ...

না না .. ব্রহ্মদৈত্য নয় .. একাবুড়ি তো সাদা কাপড় পরে। লম্বা লম্বা চুল .. চোখে লাইটিং .. এ্যাম্বুলেন্স চড়ে .. টু .. টু .. টু ... আওয়াজ হয় ...

তাই!

হ্যাঁ .. আর অন্ধকার হলে দেখতে বেরোয় কে কে ঘুমোয়নি ...

এটা আরও কিছুক্ষণ চলতে পারতো। কিন্তু লম্বা বারান্দার একপাশে দুটো ঘর পেরিয়ে তারও ওপাশে সূর্য ডুবতে বসেছে। পিলার আর গ্রিলের রেলিংগুলো কালচে সোনালী ছায়া ফেলেছে লম্বা।

সুলতান ভয় পেয়ে সরে এলো আমার কাছে।

পিয়ালিও এলো।

পিয়ালির আসাতে আমি অবাক হলাম। আমি এক্সপেক্ট করিনি ও আসবে। ইনফ্যাক্ট চাইনি ও এখানে ঢুকে পড়ুক। সুলতানকে টপকে বিছানার এদিকে আসতে ওর অসুবিধা হয় রোজই। শাড়ি-সায়া-ব্লাউজ ছেড়ে ঢিলে ঢালা রাত পোশাক পরে, মুখে ক্রিম মাখে এবং ঘুমিয়ে পড়ে। আমিও ঘুমিয়ে পড়ে। আমাদের ঘুমে সুলতান জেগে থাকে।

দাঁড়ান .. দাঁড়ান .. এটা কি হোল ?

কি?

এই যে একটা নাবালক সেক্স...

দেখুন সাবালক সেক্স ... সে তো পর্ণোগ্রাফি ... সেখানে তো আপনাদের নাক কুঁচকবে ... এদিকে আবার সেক্সও চাই ... অগত্যা ... আচ্ছা আপনাকে অন্য একটা গল্প শোনাই-

নিখিল বাইকে যেতে যেতে এক ঝলকে দৃশ্যটা প্রথম দেখেছিল। পিকনিক গার্ডেনের পাশে ফাঁকা প্যাগোডাতে ও একটা উদোম মেয়ের উপর প্রায় পাখির মত নেমে আসছে। চোখ বন্ধ। ধীরে ধীরে মেয়েটার খোলা বুক ওর ঠোঁটের নাগালে। ঠিক যখন ঠোঁট ছোঁবে তখন মেয়েটার স্তন হয়ে গেল সোনালী আপেল। সব কিছু ছাপিয়ে শুধু তার সোনালী আভাটুকুই রয়েছে। বাকি বিলকুল গায়েব।

কি মুশকিল! সেক্সের স্বপ্নে আপেল! তাও আবার নেশার বাইকে!

বার দুয়েক এরকম হওয়ার পর ও বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াস হয় ... মনে পড়ে ওর বন্ধুর তোলা সেই ছবিটার কথা – দ্য গোল্ডেন এপল। সাঙলা যাওয়ার পথে তুলেছিল ছবিটা। একটা সময় মনখারাপ কাটাতে প্রায়ই সন্ধ্যার আগে ছবিটা ডেস্কটপে খুলে মাস্টারবেট করত নিখিল।

ইন্টারেস্টিং ...

হ্যাঁ .. নাবালক, সাবালক, যৌনতা, অযৌনতা – পেরিয়ে ভিন্ন স্তরে বিষয়গুলো খেলা করে। আসলে আপনার সাপেক্ষেই রিয়েলিটি .. সেটা কোন অবস্থান নিরপেক্ষ বিষয় নয়।

বেশ এটাও ক্লজে থাকবে ...

আচ্ছা ...

পিয়ালি বলল আমাদের বাড়ির পেছনের বাগানে বাবা যেখানে সোনাঝুরি আর সেগুন গাছ বসিয়েছিল সেখানে বিহারীরা আবার ঘর তুলেছে।

তো?!

মেজকাকিমা বলেছে গতকাল সন্ধ্যাবেলার পর নাকি ঘর করেছে ...

মেজকাকিমা কিভাবে জানল ?

কাকলির মা বলেছে ...

হুঁ...

হুঁ.. কি ?

দেখছি...

আরে দেখছি মানে ?! সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে বসে আছ! যাও গিয়ে দেখে আস কি হয়েছে...

এই এক ঝামেলা হয়েছে। বাড়ির পিছনে লম্বাটে একটা বাগান আছে। তারপর নদী। আগে বাড়ি থেকে নদীটা সোজা দেখা যেত। এখন আর দেখা যায় না। নদীর পাড় জুড়ে বস্তি বস্তি বসেছে। আগে সিপিএম, এখন তৃণমূল। যার থেকে যেমন পেয়েছে টাকা নিয়েছে আর বসিয়ে গেছে। ওরা এখন আস্তে আস্তে এনক্রোচ করছে আমাদের বাগান। দুদিন আগে দুটো পাকা গাছ কেটে নিয়ে চলে গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেল পাড়ার নেতারা দুর্গা পূজো করবে বলে কেটেছে। আমাদের কিছু জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি। আজ আবার একটা ঘর ...

গেলাম পার্টি অফিসে। রমেনকাকু আর বিমলদা বসে আছে। রমেনকাকু কাউন্সিলর। বিমলদা কিছুদিন আগেও সিপিএম করত এখন রমেনবাবুর ডানহাত ... বলেন মানুষের কাজ, মানুষ ডাকছে তাই ...

আমার থেকে সবকিছু শুনে রমেনকাকু জানালেন আমাদের জমিতে ওরা কোন ঘর করতে বলেনি।

তবে ওরা যে বলল আপনাদের পার্টি থেকেই নাকি বসতে বলেছে!

দ্যাখ .. এ’পাড়ায় তোর বাবার একটা সম্মান আছে। আমরা তোদের পেছনে লাগব কেন বল? জমি জায়গার অনেক সমস্যা হয়েছে ইদানীং ... তোদের বামফ্রন্টের আমলে লোক না দেখেই পাট্টা দিয়েছিল। বর্গা করেছিল। কি লাভ হয়েছে ? সবাই কি জমি রাখতে পারে ? সেই জমি বেচার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমরা দেখছি এর ফলে যেন কোন বিশৃঙ্খলা না হয় .. জমিগুলো সিন্ডিকেট বানিয়ে একজায়গায় রাখতে চাইছি। তারপর দেখা যাবে। বাবাকে বলিস .. এটাও তো কোওপারেটিভ .. নাকি .. চিন্তা করিস না .. যা সত্যি বলে মনে হয় তাকি সবসময় সত্যি হয় ... কি রে ... যা বাড়ি যা ...

বাড়িতে ফিরে দেখলাম কেউ নেই ...

সোনালী ছেলেমেয়ে নিয়ে পিসির বাড়ি গেছে। অফিসের জামাকাপড় ছেড়ে এক কাপ চা নিয়ে বসলাম। সবে দুচুমুক দিয়েছি ডোরবেল বেজে উঠল ... পুলক এসেছে। গতকাল পার্টি অফিস থেকে ফেরা অবধি শুনে গেছে। ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল .. এত গুলো ঘটনা একসাথে ঘটছে .. কোনটা কোন টাইম ফ্রেমে ঘটছে ? এই গল্পে তাদের পয়েন্ট অফ কনভারজেন্স কি ?

ও আপত্তি করে বলেছিল .. দেখুন এরপর আপনি আপাতত আর লিখবেন না। আমাদের এগ্রিমেন্টটা ফাইনাল হোক.. ক্লজগুলো সেটলড হোক...

পুলক বসেই, কোন ভণিতা না করে ব্রিফকেস খুলে ডিডের পেপারটা বের করে ফেলল। একটা কুড়ি টাকার স্ট্যাম্প পেপারে ডিডটা শুরু হয়েছে –

SRI. PULAK MITRA, son of Sri. Dhanesh Chandra Mitra, by faith Hindu, by occupation Self employed, residing at 24/73A, Khudiram Bose Sarani (Previously known as Belgachia Road), P.S. Ultadanga, Kolkata – 700037, hereinafter referred to as the “READER” (which term and expression shall unless excluded by or repugnant to the context be deemed to include his heirs, successors, executors, administrators, legal representatives and assigns) of the ONE PART.

AND

SRI. ARUN ROY, son of Late Kanailal Roy, by faith Hindu, by occupation Government Clerk, residing at C-1/9, LIG Housing Estate, Duttabagan, Belgachia, Kolkata – 700 037 hereinafter referred to as the “STORY WRITER” (which term and expression shall unless excluded by or repugnant to the context be deemed to include his heirs, successors, executors, administrators, legal representatives and assigns) of the OTHER PART.

WHEREAS by a Bengali kayemi mourusi mokrasi patta dated 10.05.1957 made between Kumar Jagadish Chandra Singha Bahadur son of Late Raja Birendra Chandra Singha Bahadur therein described as a party of the First Part and Smt. Dinatarini Debi, wife of Late Hari Charan Mukhopadhyay described thereon as party and registered ….

আমি একটু ঘাবড়ে গেলাম। ওর এই চুক্তিপত্রের প্রস্তাব শুরুতে আমি মেনে নিয়েছিলাম। আর কোন উপায়ও ছিল না। আমার এই গল্পের একমাত্র পাঠক পুলক। আর কেউ পড়বে কিনা আমি সত্যি জানিনা। পুলক অনেকদিন ধরেই চাইছিল যে আমাদের মধ্যে একটা এগ্রিমেন্ট হোক ... যে এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী গল্প লেখা ও পড়া চলবে ... ...

ও পড়া শেষ করে জলের বোতল বের করে ঢক ঢক করে জল খেল। তারপর শেষ পাতাটা দেখিয়ে বলল আপনি এখানে সই করে দিন। বৌদি ফিরলে সাক্ষীর কলমে সই করিয়ে নেব।

এতক্ষণে আমি ধাতস্থ হতে শুরু করেছি। ইনফ্যাক্ট মজা লাগছে ... আমি পুলককে বসিয়ে রেখে ঘরের মধ্যে পায়চারি শুরু করলাম ... না পুলক আপনার এই চুক্তিপত্রে আমি সই করতে পারব না।

পারবেন না !

না। এখানে সম্ভাবনাকে সূত্রায়িত করা হচ্ছে। রূপকথা, যৌনতা, মধ্যবিত্ত জীবন ও রাজনীতি – এই যে ক্লজগুলো – এর বাইরে গল্পটা আর বেরোতে পারবে না। জীবন সম্ভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠে। তাই রূপকথা, যৌনতা, মধ্যবিত্ত জীবন, রাজনীতি – এর যে ক্যাকোফোনি তা পারস্পরিক এক বিস্তৃত অপরিমেয় সম্ভাবনার জন্ম দেয়।

পুলক আচমকাই কেমন অগোছালো হয়ে পড়ে ... সে উঠে যেতে যেতে বলে আপনি সিস্টেমকে আন্ডারএস্টিমেট করছেন ... এটা আপনি করতে পারেননা ... আমি কিন্তু আসব আবার ...

আমি স্মিত মুখে সিঁড়িতে ওর চলে যাওয়ার শব্দ শুনতে শুনতে দেখি ডিডের পাতাগুলো ঘরময় উড়তে শুরু করেছে .. জনিদের বৃষ্টি পড়ছে ঘরময় ...