গল্প : শুভ্র চট্টোপাধ্যায়

তিন নম্বর বাড়ি

বিশ বছর আগে এই পাড়াটা ছিল গাছপালায় ঢাকা। বাড়িগুলো অনেকটা জায়গার ওপর থাকত। মাঝে মাঝে কিছু জমি ফাঁকা। বাচ্চারা খেলত সে জমিতে। পয়লা বৈশাখ আর বিজয়া সম্মিলনে স্টেজ বেঁধে ফানশান হত। এখন অবশ্য পাড়াটা ফ্ল্যাটে ভর্তি। কয়েকটা মাত্র বাড়ি আগের মত থেকে গেছে। আমার বাড়িটাও তাই। কিন্তু সে বাড়ি তালাবন্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। বাড়িটা ছাড়াও এ পাড়ায় আমার একটা ছোট ফ্ল্যাটও আছে। সেটা আমি ভাড়া দিই। উচিত ভাড়া পেলে ভাড়াটিয়া নিয়ে আমার কোনও মাথা ব্যথা থাকে না। সচরাচর শহরে যারা ভাড়া পায় না, যেমন মুসলিম, একা মেয়ে, এক মা --- আমি তাদেরও নির্দ্বিধায় দিয়ে দিই। আসলে টাকা ছাড়া আমার দ্বিতীয় কোনও নেশা নেই। আমি অবিবাহিত। আমার বাবা ভালো সম্পত্তি রেখেই পৃথিবী ছেড়েছেন। আমি যখন ক্লাস ফাইভে তখন আমার মা মারা যান। বাবা আর বিয়ে করেন নি কিন্তু বড়ো হয়ে বুঝেছি যে কেরানী পাড়ার মিষ্টি মাসী আসলে বাবার রক্ষিতা। এই নিয়ে আমি অবশ্য কোনও গোলমাল করিনি। বাবা আমাকে ভালোবাসতেন। মিষ্টি মাসীকে বিনা প্রতিবাদে মেনে নেওয়ার ফলে তিনি আমাকে প্রায় সব কিছুই দিয়ে গেছেন।

টাকার নেশা থাকলেও মেয়েদের ব্যাপারে আমি নিরাসক্ত। আমার ধারনা এর ফলে আমার অনেক টাকা বাজে খরচের হাত থেকে নিস্তার পায়। আমি জানি যে নারীর জন্য টাকার দরকার হয় না কিন্তু টাকা দিয়ে নারী পেতে গিয়ে বহু পরিচিত লোক ফতুর হয়েছেন। তাই আমি আমার টাকা ও সম্পত্তি নিয়ে খুশি। আমার একমাত্র নেশা তিলে তিলে সে সব বাড়িয়ে নেওয়া। আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমার কোনও মেয়ে বন্ধু নেই।

আমার পাড়ার বাড়িটিতে তালা থাকার কারণ আমার বসবাস বেশ কয়েক বছর হলো তৃতীয় আরেকটি বাড়িতে। সেটার কথা পড়ে বলব। পাড়ার ফ্ল্যাটটা ভাড়া দিয়েছি পিংকি নামের একটি মেয়েকে। তাঁর বয়স তেইশ চব্বিশ হবে। সতের বছর বয়সে পিংকির বিয়ে হয়েছিল এক প্রাইমারি টিচারের সঙ্গে। হাসিখুশি দেখতে ছেলেটি আসলে যে যৌন বিকৃতি থেকে তৃপ্তি পায়, সেটা কেউ আগে জানে নি। পিংকিই প্রথম জেনেছিল। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় সে বাপের বাড়ি স্থায়ীভাবে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর এক বছরের মাথায় তাঁর কাছে বাপের বাড়িও অসহ্য হয়ে ওঠে। একই অবস্থায় তাঁর চেনা জানা দু-জন মেয়ে আত্মহত্যা করলেও পিংকি মরে যেতে চায় নি। সে এসকর্ট সার্ভিসের কাজ নিয়ে শহরে চলে আসে। এই সব মেয়েদের কাছে মোটা টাকায় বাড়ি ভাড়া দেওয়া যায় জেনে তাঁদের খোঁজ আনার জন্য একটা দালাল লাগিয়ে রেখেছিলাম। এমনিতে ফ্ল্যাটটার ভাড়া ছিল সাড়ে চার হাজার। পিংকি কোনও দরদাম না করেই ছয় হাজারে রাজি হয়ে গেল। সে বুঝেছিল নিরাপত্তা। মেয়েরা অনেক কিছু বোঝে। হয় তো আমাকে দেখেই বুঝেছিল যে তাঁর শরীরের প্রতি আমার কোনও টান নেই। বিনে পয়সায় খেতে চাইব না তাঁকে।

এখন আমি পিংকির কাছে মাঝে মাঝে চা খেতে যাই। পিংকি ভালোই ব্যবসা করছে। সে টাকা জমিয়ে ভবিষ্যতে কিছু করার আশা করে। আমি তাঁকে বলেছি যে নিয়মিত ভাড়া বাড়িয়ে গেলে আমি তাঁকে কোনও দিন উঠতে বলব না। তা ছাড়া পিংকির জন্য আমি কাস্টমারও যোগার করি। এই ব্যাপারে আমার বিশেষ একটা ক্ষমতা আছে। মেয়ের জন্য কোন পুরুষ দু-পয়সা খরচা করতে চায় তা আমি অনায়াসে বুঝতে পারি। তাই মাসে দু-একটা শাঁসাল পুরুষ আমি ধরে দিই পিংকিকে। গায়ে হাওয়া লাগিয়েই এই কাজ করি আমি। পিংকি লেনদেন-এর ব্যাপারে খুব স্বচ্ছ। সে কমিশন দেওয়ার ব্যাপারে কিছু লুকোয় না। মাঝে একটা ঝামেলা হয়েছিল পাড়ায় পিংকিকে নিয়ে। কিন্তু এখন সে সব মিটে গেছে। আমি, পিংকি কিংবা আমাদের কাজ কারবার নিয়ে পাড়াতে আর কোনও মাথা ব্যথা নেই।

আমার এমনিতে তেমন কোনও কাজ থাকে না। পিংকির জন্য খদ্দের খুঁজতে বেড়াতে আমার বেশ মজা লাগে। কিন্তু এবারের খদ্দেরের জন্য আর ঘোরাঘুরি করতে হবে না। সে আমার পাড়াতেই থাকে। পাড়ায় আমার বাড়িটা থেকে তিনটে বাড়ি পরে রাজেনবাবুর বাড়ির নিচ তলায়। বাড়িটার ভাড়া বেশ ভালোই। সুতরাং খদ্দেরটির পয়সা কড়ি কিছু আছে। তিনি সেদিন বাড়ি থেকে সকাল সোয়া ন-টা নাগাদ বেরিয়ে যখন টোটোতে উঠবেন, তখন আমি প্রথমবার তাঁর চোখে চোখ রাখি। বুঝতে পারি যে এই একা সচ্ছল মাঝ বয়সী প্রবাসী পুরুষটির একজন নারী সংসর্গ প্রয়োজন। এরপর জানলাম যে ব্যক্তিটি ব্যাংকের উঁচু তলার চাকুরে। বিহারের লোক, কিন্তু বাংলাতেই চাকরিসূত্রে অনেকদিন কাটাচ্ছেন। পরিবার থাকে কলকাতায়। সকাল সাড়ে নটার আগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফিরে আসেন রাত আটটা সাড়ে আটটায়।

দিন চারেক আগে রাত্তির আটটা কুড়িতে তিনি যখন রিক্সা থেকে নেমে বাড়িতে ঢুকতে যাবেন তখন আমি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘আপনাকে পাড়ায় নতুন দেখছি!’

আকাশে একটু একটু মেঘ ডাকছিল। পাড়ার গলিটা ফাঁকা। তিনি একটু হেসে বললেন, ‘এখানে ভাড়া এসেছি। লাস্ট মান্থে।’

‘একা?’ আমি জানতে চাই।

‘ফ্যামিলি আছে কোলকাতায়। এখানে আমি ব্যাচেলার!’ বলে তিনি বেশ খানিকটা হাসলেন। আমি দেরি না করে বললাম, ‘চাইলে এখানেও ওয়াইফ জুটে যাবে।’

তিনি কয়েক সেকেন্ড আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শেষে মুচকি হাসলেন। বললেন, ‘আসুন আপনি ভিতরে। আমি ভালো কফি বানাই। আসুন।’

সত্যিই তিনি অসাধারণ কফি বানাতে জানেন। সে কফি খেতে খেতে আমি তাঁর মনের সুপ্ত আশার কথা বের করে ফেললাম। প্রবাসে নিঃসঙ্গ জীবনে একটি নারী শরীর তাঁর খুবই প্রয়োজন। মাসে দু-একদিন নির্জন অরণ্য ঘেঁষা কোনও রিসর্টে চলে যেতে পারেন তাহলে। ব্যাংকের অপরিসীম কর্মক্লান্তি থেকে মুক্তি পেয়ে অনেক সতেজ হয়ে উঠতে পারবেন এই সংসর্গের ফলে। কিন্তু অচেনা শহরে কোথায় বা পাবেন একটি নারী। টাকা নিয়ে সমস্যা না থাকলেও কে এনে দেবে খোঁজ?

কফির কাপ নামিয়ে আমি বললাম, ‘এ পাড়াতেই আছে। বলুন তো মিট করিয়ে দেব।’

তিনি বিস্ময়ের সুরে জিগ্যেস করলেন, ‘বলেন কী? এটা পসেবল্?’

‘অবাক হওয়ার কিছু নেই। আমি সব ওপেনলি করি।’ আমি বিনয়ের ভঙ্গিতে জানাই। ‘কাছেই থাকে। আনন্দ এপার্টমেন্ট। মাঝে মাঝে রাত ন-টার দিকে এসে আপনার জন্য রান্না টান্না করে, রাত্তিরটা আপনার সঙ্গে থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে চলে যাবে। এতে লোকের চোখে পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নেই বললেই চলে।’

‘এখুনি তো বললেন ওপেন্লি করেন? লোকের চোখের কী ভয়?’

‘আপনার ঘর থেকে বেরুতে দেখলে স্যার আমাদের কী যায় আসে!’ আমি কেটে কেটে বলি। তিনি ভুল বুঝতে পেরে হাসেন। লোকটির চেহারা বেশ সুন্দর। ভুঁড়ি অল্প। হাসলে ভালোই দেখায়। তিনি হাসতে হাসতে মাথা ঝাঁকিয়ে বলতে লাগলেন, ‘অনেক ভোরে এই লেনে কেউ ওঠে না বলছেন? গুপ্পে রায় আছে না? সে তো শুনলাম এই এলাকা চালায়!’

গুপ্পে রায় পাড়ার ক্লাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং উঠতি প্রভাবশালী ব্যক্তি। বিরুদ্ধে প্রচুর অভিযোগ। কিন্তু গুপ্পে রায় কোনও কিছুরই পরোয়া করে না। আমি জানি সে আসলে একটা পাকা শয়তান। পিংকিকে নিয়ে ঝামেলাটা ওর জন্যই হয়েছিল। কিন্তু সেটা এখন আর কোনও সমস্যাই নয়।

আমি তাই বললাম, ‘গুপ্পে রায় কোনও প্রবেলম না। তাহলে কি এর মধ্যে একদিন এই সময়ে পিংকিকে নিয়ে আসব? এখন তো প্রায় দিনই বৃষ্টি হচ্ছে। সন্ধের পর যেদিন বৃষ্টি থাকবে সেদিন দু-জন ওয়াটার প্রুফ গায়ে দিয়ে চলে আসব। কেউ লক্ষ্য করলেও টের পাবে না। আপনি নিশ্চই লক্ষ্য করেছেন যে রাত্তির আটটা-নটার দিকে ওয়েদার খারাপ থাকলে রাস্তাটা পুরো ফাঁকা হয়ে থাকে। গলিটায় একটা দোকানও তো নেই। তা ছাড়া রাস্তাটাও খুব একে বেঁকে চলে গেছে।’

টানা কথা গুলো বলে আমি থামলাম। বলার সময় দেখে নিয়েছি যে তাঁর চোখের ভাব বদলে যাচ্ছে। এবার তাঁর রাজি হওয়া উচিত।

‘ঠিক আছে। আপনি আগে ফোন করবেন। বাট কতটা, মানে, স্যালারি কত দিতে হবে?’

আমার অনুমান সত্যি হলো। উঠতে উঠতে বললাম, ‘আমি ইন্ট্রোডিউজ করিয়ে চলে যাব। আপনি কাজ বুঝিয়ে দেবেন। সে স্যালারি বলবে।’

‘ভেরি নাইস। কিন্তু একটা প্রবলেম থাকছে। ল্যান্ড লর্ড জানতে পারবে এসব?’

‘রাজেন বাবু?’ আমি অভয়ের সুরে বলি। ‘তিনি আর তাঁর বউ দু-জনেই ওভার সিক্সটি। সন্ধের পর খাটে বসে সিরিয়াল দেখেন। রান্নার লোক সাতটা থেকে সাড়ে সাতটার মধ্যে চলে যায়। বেশি শব্দ টব্দ না হলে কোনও প্রবলেম নেই।’

‘ওকে ওকে!’ বেশ ভারমুক্ত দেখাল তাঁকে। পকেট থেকে একটা ছোট্ট কৌটো বের করে ভারি একটু মশলা বের করে খেতে দিলেন। মশালটি ভারি সুগন্ধী। পিংকিও বেশ পছন্দ করবে এই গন্ধটা। আমি তাঁর ভিজিটিং কার্ড নিয়ে বেরিয়ে এলাম। কার্ড পড়ে দেখলাম একটু ভুল জানতাম। ব্যাংকে নয়, তিনি কাজ করেন পিএফ আপিসে।

পরশুর আগের দিন এসব কথা হয়েছিল। গত দু-দিন বিকেল থেকে রাত দশটা সাড়ে দশটা পর্যন্ত আবহাওয়া খারাপ ছিল না। তবে আজ বিকেল থেকে যে ভাবে ঘন মেঘের দল আকাশ থেকে ঝরতে শুরু করেছে তাতে নিশ্চিত গোটা রাত দুর্যোগ চলবে। তাই সন্ধে সাড়ে ছটা নাগাদ তাঁকে ফোন করেছি। তিনি বলেছেন ঠিক ন-টার সময় কলিং বেল টিপতে। তবে বৃষ্টির তেজ কমে গেলে যেন ঝুঁকি না নিই। এখন রাত্তির আটটা পঞ্চান্ন। ঝুঁকি নেওয়ার কোনও পরিস্থিতিই নেই। বৃষ্টি রীতিমত তেড়ে হচ্ছে এখন। তার ওপরে সামনের পথবাতিটা নিভে থাকার কারণে রাজেশবাবুর দোতলা বাড়ির মুখটা রীতিমত আবছা। আমি আর পিংকি বাড়িটা থেকে কুড়ি ফুট আগে দাঁড়ালাম। কেউ লক্ষ্য করার নেই জানা সত্ত্বেও একবার দু-পাশটা ডেকে নিলাম। রাস্তার পাশে গ্রিলের গেট দিয়ে তিন চার পা হাঁটলেই ঘেরা বারান্দা। লোহার গেট খুলে ঢুকলেই একতলায় প্রবেশ হবে। বারান্দার এক কোন দিয়ে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ি। যেহেতু সন্ধের পর কাজ না থাকলে বুড়ো বুড়ি নিচে নামে না, তাই রাস্তা আর বারান্দার গেটে তালা দেওয়ার দায়িত্ব তাঁরই।

বারান্দার গেটে পাশে কলিং বেলের সুইচ টিপলাম আমি ঠিক নটা বাজতে এক মিনিট আগে। বারান্দার আলো না জ্বালিয়ে তিনি মোবাইলের আলোয় ঘর থেকে বেরিয়ে এসে গেটটা একটু ফাঁক করলেন। আমরা বারান্দায় উঠে চটপট বর্ষাতি থেকে মুক্ত করলাম নিজেদের।

‘আসুন।’ তিনি চাপা স্বরে ডাকলেন। আমরা ঘরের ভেতরে পা দিলাম। উজ্জ্বল সাদা আলোয় সালোয়ার কামিজ পরা পিংকির দিকে তাকিয়ে তিনি আনন্দিত হলেন। বুঝলাম আমার চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু যাওয়ার আগে একটা জিনিস বলার আছে। তাই পাঁচ দশ মিনিট আমাকে থাকতেই হবে।

‘বসুন বসুন।’ তিনি পিংকির থেকে চোখ সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন। পিংকি কোমরে একটু ছন্দ তুলে, নিতম্বে কয়েকটি আন্দোলন জাগিয়ে কয়েক পা হেঁটে দূরের সোফাটায় বসল। তিনি মুগ্ধ চোখে দেখলেন। তারপর আবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আরে বসুন। কফি খান।’

‘আপনি খান। পিংকি বানিয়ে দেবে।’ আমি একটু হাসি। ‘কোনও টেনশন নেবেন না। গুপ্পে রায় আমার কাছে ঠাণ্ডা।’

‘আপনিও কি পলিটিক্স করেন?’

‘একদম না। আমার গল্পটা আলাদা। দু-মিনিট বলেই যাই। ইন্টারেস্টিং।’

‘বলেন বলেন।’ তিনি বেশ উৎসাহ দেখালেন।

‘একদিন আমি পিংকির সঙ্গে দেখা করতে ফ্ল্যাট গেছি। তখন রাত দশটার মত হবে। পিংকি থাকে চারতলায় আর গুপ্পে রায়ের একটা ফ্ল্যাট আছে তিনি তলাতে।’

‘বলেন কি?’ তিনি অবাক হলেন। ‘একই বিল্ডিং?’

‘ফ্ল্যাটটা আসলে তাঁর মাল খাওয়ার জায়গা। পিংকিকে সে দু-একবার অফার দিয়েছিল বাইরে ঘুরতে যাওয়ার। কিন্তু পিংকি রাজি হয় নি। পয়সা দিলে অবশ্যই রাজি হত। কিন্তু গুপ্পে রায়ের ধান্ধাই হলো বিনে পয়সায় করা। ওর এগেন্সটে রেপের কেসও হয়েছিল, জানেন তো?’

‘আই সি।’ তাঁকে যেন বেশ ভাবিত দেখাল।

‘সেদিন পিংকির ফ্ল্যাটের সামনে দাঁড়িয়ে কলিং বেল টিপলাম। আমার বেল টেপার একটা স্টাইল আছে। পিংকি বোঝে আমি এসেছি। কিন্তু দরজা খুলল না। আমার মনে হলো ও ঘুমোচ্ছে। কারণ আসার পনের বিশ মিনিট আগে ফোন করেছিলাম ওকে। মোবাইল ধরেনি। আমি আরো দু-তিন বার বেল টিপলাম। ফোন করলাম। কিন্তু সাড়া নেই। ভাবলাম একটু ছাদে গিয়ে হাওয়া খেয়ে আবার ফিরে এসে ডাকব ওকে। দিনটা বেশ গরম ছিল। কিন্তু সিঁড়ি দিয়ে কয়েক পা উঠতেই মনে হলো আরেক বার ট্রাই করি। তাই আবার ফ্ল্যাটের দরজায় ফিরে এসে কলিং বেল না টিপে দরজায় জোরে নক্ করলাম।’

আমি থামলাম। তিনি গভীর আগ্রহের সঙ্গে শুনছিলেন। আমি থামতেই তিনি বলে উঠলেন, ‘নক্ করলেন লেকিন খুলল?’

‘প্রথম টোকার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে খট করে একটা শব্দ। বুঝলাম দরজাটা খুলে গেছে। সেটা ঠেলে ঢুকতে যাব, ঠিক তখনই সেটা খুলে গেল। দেখলাম দরজার ওপাড়ে গুপ্পে রায়। আমার মাথার মধ্যে আগুন ধরে গেল। আমি ধাক্কা দিয়ে তাঁকে ভেতরে ঠেলে দিয়ে ঢুকে গেলাম। দু নম্বর বেড রুমে দেখলাম পিংকিকে। বিছানায় চিত হয়ে আছে। চোখ দুটো অর্ধেক করে খোলা। শরীরে পোশাক নেই।’

‘ও মাই গড!’ তিনি এবার আন্তরিক ভাবে বিচলিত হলেন। ‘কী বলছেন আপনি?’

‘কিন্তু ফ্ল্যাটে গুপ্পে রায় একা ছিল না। ওরা ছিল দু-জন। উত্তেজনার কারণে আমি দ্বিতীয় জনকে লক্ষ্যই করি নি। পিংকির অবস্থা দেখে আমি হতবাক্ হয়ে থমকে যেতেই সেই দুই নম্বর আমার মাথার পেছনে ইস্তিরি দিয়ে বাড়ি মারে। তারপর আমার আর কিছু মনে ছিল না। পিংকির মত আমাকেও ফাইনালি মারা হয়েছিল গলা টিপে। দুটো লাশ প্রায় পাশাপাশি পড়ে ছিল।’

‘কী পাগলের মত বলছেন আপনি?’ তিনি বেশ জোরে, প্রায় ধমকের সুরে বললেন আমাকে। আমি চুপ করে থাকলাম। জানি এসব শোনার পর কোনও মানুষই বিশ্বাস করতে চায় না। তিনিও করছেন না। ফলে আরো একটা জিনিস করতে হয় আমাকে। আমি তাই তাঁর চোখে চোখ রেখে শান্ত ভাবে বলি, ‘লাশ দুটো দেখুন। মেঝের দিকে তাকান। ঠিক এইভাবে পড়েছিল।’

তিনি তাকালেন। তাঁর চাউনিতে অসম্ভব বিস্ময় ফুটে উঠল। তিনি কাঁপতে লাগলেন। তাঁর শরীরের ঘাম হতে লাগল। মুখ দিয়ে আওয়াজ বেরুতে লাগল গোঁ গোঁ করে। দুই চোখ বিস্ফারিত করে তিনি আমাদের দিকে তাকাতে চাইলেন। কিন্তু আমি জানি যে তিনি আমাদের লাশ দুটো ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। সোফায় আর মেঝেতে প্রায় পাশাপাশিই পড়ে থাকা দুটো লাশ তিনি এখন প্রবল আতঙ্কে প্রত্যক্ষ করছেন। যদিও আমি আর পিংকি এর মধ্যেই পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি। কিন্তু তিনি দেখতে পাচ্ছেন না।

তিনি ঘর থেকে পালাতে চাইলেন। ভেতরের ঘরের দিকে ছুটলেন। কিন্তু পারলেন না। টলতে টলতে মুখ থুবড়ে পড়লেন। ভেতরের ঘরের দরজার ভেতরে শরীরে অর্ধেকটা পড়ল তাঁর। শরীরটা দু তিনবার কেঁপে উঠে স্থির হয়ে গেল। হয় তো তিনি মারা যাবেন। হয় তো বেঁচে যাবেন। পিংকির জন্য যে সব কাস্টমার এখন ঠিক করি তাঁরা কেউ কেউ মরে যায়, কেউ বা সামলে ওঠে। তাঁদের পরিণতি আমার ভাবনার বিষয় নয়। হয় তো বলবেন যে কাস্টমারদের কী দোষ? কিন্তু আমি জানি যে, যা ঘটার তা ঘটবেই। কাউকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের কি কোনও দোষ ছিল?

তাঁর শরীরটা স্থির হয়ে যেতেই পিংকি হাততালি দিয়ে হেসে উঠল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আরো একটা হলো! ভাবিই নি যে পাড়াতেই কাস্টমার পেয়ে যাব।’

আমি পিংকির দিকে তাকিয়ে হাসলাম। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আমরা দু-জন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে রাজেনবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম রাস্তায়। বৃষ্টি ভেদ করে উঠতে থাকলাম ওপরে। তারপর উড়তে শুরু করলাম নদীর দিকে। নদীর ওপাড়ে পরিত্যক্ত শ্মশানের গাছপালা ঢাকা জমির একটা প্রাচীন অশ্বত্থ গাছে পিংকি থাকে এখন। আর সেই জমি ছাড়িয়ে আরো খানিকটা দূরে একটা বন্ধ হওয়া চা বাগান টপকে শুরু হওয়া অরণ্যের সীমায় শতাব্দী প্রাচীন শালগাছগুলোর একটা আমার তিন নম্বর বাড়ি।

ইচ্ছে করলে পিংকির সঙ্গে এক বাড়িতেই থাকতে পারি এখন। কিন্তু গোড়াতেই বলেছি যে নারী বিষয়ে আমার কোনও আসক্তি নেই।