গল্প : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

জ্যোৎস্নায় কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটবে? 

কতটা সমুদ্র ছিলো আর কতটা আকাশ? অমন উচ্চতায় জল ডাঙার ফারাক করা দুষ্কর হয়ে ওঠে। সেবার ছিলো উইন্ডো সীট। বিমান যখন অতলান্তিকের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো রনি বুঝে নেবার চেষ্টা করছিলো কোথায় ডাঙা গিয়ে জলে মিশছে আর কোথায় জল গিয়ে ডাঙায় আর আকাশটাই বা আছে কোথায়, কতটুকু? সব যেন মিলেমিশে সাদা হয়ে যাচ্ছিলো জানলার বাইরে। একটাই রং, অপলক সাদা, একটাই পৃথিবী, আদিগন্ত শ্বেতপাথরের থালায় হাওয়ার আঁকিবুঁকি নিমেষে মিলিয়ে যাচ্ছিলো। সাদার ওপর আরো সাদার প্রলেপ তৈরি হচ্ছিলো আর রনির ডাঙা-জল-আকাশ ফিসফিস করে বায়বীয় দেশান্তরের কথা বলছিলো। গৃহত্যাগের কপালে তখনও চুম্বন লেগেছিলো। সাত দিনের জন্য বাড়ি থেকে বেরোলেও শয্যাশায়ী ঠাকুমা কান্না জুড়ে দিত আর রনির মা যেত খেপে। ছেলে বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কান্না খুবই অমঙ্গলের ব্যপার! রনির অবশ্য এনিয়ে একটা থিওরি ছিল। তার মনে হত ঠাকুমার গলাখানই অমন হয়ে গ্যাছে শুয়ে শুয়ে। একটা বয়েসের পর এমনি হয়ত হয়, কথা বলতে গেলেই  কেঁপে কেঁপে কান্নার মত কিছু একটা গলা ঠেলে ডগমগিয়ে ওঠে । রনির মনে হত ঠাকুমা যেন কান্নার ভেতর থেকেই কথা কইছে। সেই কথা জলের মধ্য দিয়ে ডাঙায় উঠে আসছে বাতাস চিরে শব্দগুলো ইস্ট-ওয়েস্ট, কোনো ম্যান-কালারের দিকেই যাচ্ছে না, গ্রেস্কেইলেই সন্তুষ্ট থাকছে মা এরকম থিওরি-টিওরি কানে তুলতো না। মার কানে ঠাকুমার কান্নার কম্পন সময়ের দীর্ঘ এক রেখার আগল খুলে দিত যেখানে অনেক বছরের অনেক শব্দ, হাহুতাশ আর বিবাদ ঘর করেছিলো। সেসব সেই আমলের কথা যখন বিজলিগ্রীল আইসক্রিম সোডা মিলত কলকাতার দোকানে দোকানে। মার কাছে কিন্তু অত বছরের অত জমে থাকা কথা সবই গতকালের রুমালে জড়িয়ে ছিলো মাঝে মাঝে রুমাল চাপলে বিন্দু বিন্দু জলও দেখা দিত। 

 

তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। দেশান্তর জাঁকিয়ে বসেছে। হাসি কান্না সাদা হয়ে গেছে আসমুদ্র মহাকাশে আর রনিও আস্তে আস্তে সব শহরের ভেতরকার চক্রান্তমূলক লেনদেন একটুআধটু বুঝতে শিখেছে। বুঝতে শিখেছে বেশি রাতের অল্প নেশায় চোখ আলগা হয়ে আসলে কি কলকাতা আর কি সিডনী? রাতের শহর তো শুধু নিয়ন আলো দিয়ে কথা বলতে জানে। একটা আলো থেকে আরেকটা আলোর দিকে এলোমেলো পায়ে হেঁটে যেতে যেতে রনির নতুন পুরোনো রাস্তাগুলোকে মনে পড়ে। পুরনো নতুন মুখগুলো যারা সঙ্গী আর বন্ধুর মাঝামাঝি অন্ধকারে দুই হাতে প্রদীপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখন রনির স্ত্রীও থাকে এদেশে। তাদের কর্মক্ষেত্র যদিও আলাদা। রনির কাজ কারবার সিডনীতে আর তার বউ তিয়া থাকে ক্যানবেরায়। ক্যানবেরা সিডনী আর মেলবোর্নের মাঝামাঝি মেট্রোপলিসের দাপটহীন এক তৃতীয় সূত্র। এই মহাদেশের বুশ ক্যাপিটাল। দুসপ্তাহ অন্তর অন্তর ঘণ্টা চারেক মোলায়েম বাসে চেপে রনি আর তিয়া উইকএন্ড কাটাতে যায় একে অপরের শহরে। সিডনীতে শহরের সুবাস আর ক্যানবেরায় প্রকৃতির। দুটো একেবারেই দুধরণের শহর। সিডনীতে সমুদ্র, অপেরা হাউস আর বীচ-লাইফ। ক্যানবেরা পার্বত্য, শীতে কখনো সখনো বরফও পড়ে সেখানে। ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে ওঠে রাজধানীতে। সিডনীতে সমুদ্র রক্ষা। তিয়া আর রনি সবসময়ই ঠাট্টা করে বলে ওদের শহর অদল বদল করে নেওয়া উচিত ছিলো। রনি শীতের রিক্ততা পছন্দ করে আর শীত আসলেই তিয়ার মনে অঘ্রাণের বিহ্বল উদাস জাগে। অথচ রনি রয়েছে ঝলমলে সিডনীতে আর তিয়া কিনা শীতার্ত ক্যানবেরায়। তবে ওরা দুজনেই উইকেন্ডের এই চেঞ্জটার দিকে তাকিয়ে থাকে। রনির শহরের সীমানা ছাড়িয়ে পাহাড় আর হ্রদের বুশ ক্যাপিটালে আসতে ভালো লাগে। একা হোক আর দোকা, বৃষ্টি বা রোদ যাই হোক না কেন, পাহাড়ে চড়তে সে বেশ পছন্দ করে। শিখরারোহণে তার পুরুষ-শরীর হয়ত বা পুলকিতকাম হয়ে ওঠে। বার্লি গ্রিফিন লেকের ওপর কুয়াশা নেমে এলে রনির মনে হয় এই বুঝি লক নেস দ্বীপের মিষ্টিদানব নেসী আলস কাটিয়ে গা থেকে জল ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে আসবে। ব্ল্যাক মাউন্টেনের ওপরকার টাওয়ার থেকে হ্রদরেখার দিকে চোখ রাখলে তার আকুলি বিকুলি পথে বিভঙ্গে ভরা অতিকায় এক শরীরের আভাস মেলে। তিয়ারও সিডনী বেশ পছন্দ। ডাবল ডেকার ট্রেনে চড়ে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে তারও। ক্যানবেরার তুলনায় সিডনীর মানব-বৈচিত্র্য বেশী। একেকটা শহরতলী একেকটা খুদে খুদে পাড়াসেখানে কালচারগুলোও বদলে বদলে যায়। কোথাও মধ্য প্রাচ্যের মানুষ বেশী, কোথাও আবার এশিয়ান ছয়লাপ। অস্ট্রেলিয়াতে ‘এশিয়ান’ বলতে চীন-জাপান-কোরিয়ার মানুষদের বোঝায়। ভারতীয়দের এদেশে ভারতীয়ই বলা হয়। তারা এশিয়ার অংশ না অংশ নয় এটা বিশেষ গুরুত্ব পায় না।  ট্রেনে বাসে কান পাতলে ইওরোপ, আমেরিকা, এশিয়া মিলিয়ে কতরকম ভাষাই না শুনতে পাওয়া যায়। ক্যানবেরায় ট্রেন নেই, আর বাসে উঠলেও বাঁধাধরা ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা কমই শোনা যায়। রাজধানীর জন্যেই হয়ত, ক্যানবেরা খানিকটা হলেও আমলাদের শহর। আর সিডনী টুরিস্টদের। মেলবোর্নের থেকেও বেশি ‘মাল্টিকালচারাল’--কালচার সত্যিই ভালচার হয়ে পথে পথে ডিসপ্লে দিয়ে বসে আছে। যে যার দেশের বাইরে শরীরের চৌহদ্দিতে দেশের দোকান দিয়েছে যত্রতত্র।  সিডনীর ট্রেনে তিয়ার অজানা ভাষা শুনতে ভালো লাগে। ভালো লাগে যখন শ্রবণ কেবলই শ্রবণের জন্য ঘটে, অর্থের তোয়াক্কা করে না। শব্দগুলো কতরকম ধ্বনি, গড়ন আর কাঁপন নিয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে আসে। বোঝার দায় না থাকলে শব্দের শরীরের দিকে কান দেওয়া যায়। আর কান দিলেই কত শব্দ বাংলার মত লাগে। বাংলা কোন এক শব্দের কান ঘেঁসে বেরিয়ে যায় অজানা ভাষার শব্দরতি। তিয়ার পরিচিত একটা বাংলা শব্দ হতে হতেও শেষপর্যন্ত যেন আর হয় না, অজ্ঞাত এক ধ্বনি তরঙ্গ হয়েই বেজে ওঠে কানে। তিয়া ফিসফিসিয়ে রনির কানে বলে: 

 

-- ঐ শেষ শব্দটা শুনলে যেটা বলে উঠে গেলো ছেলেটা, মেয়েটার পাশ থেকে। একেবারে ‘কলস’ এর মত শুনতে লাগলো না?

 

-- কলস? তাই বুঝি? ঠিক খেয়াল করিনি তো!

 

-- তুমি আর খেয়াল করো কই? কানের মধ্যে মনটাকে ধরে রাখতে পারলে শুনবে কত অজানা শব্দ জানা হতে হতেও হয় না। এটা একটা খেলার মত। এক আর আলাদার খেলা বলতে পারো। 

 

-- অজানা শব্দ জানা হতে হতেও হয়নাটা কিন্তু একেবারে রাজা আসতে আসতেও এলো না’র মত হয়ে গেলো। 

 

-- রাজা আসতে আসতেও এলো না মানে? 

 

-- ওহ! তোমায় বলিনি এই গল্পখান। আমরা ছোটবেলার গল্প। গল্পবেলার গল্প। গল্প বলার গল্পও বলতে পারোআমি তো ভাবলাম তোমায় বলেছি আগে 

 

-- না তো! অন্তত মনে তো পড়ছে না। তুমি কি যে বলো আর কি না বলো! 

 

-- তা ঠিক। ছোটবেলা থেকেই স্কুলের ডায়েরীতে লেখা থাকত: “ক্লাসে কথা বলে।”

 

-- আর তুমিও ক্লাসে কথা বলাটাকেই পেশা বানিয়ে ফেললে, বলো?

 

--তা একরকম ঠিক। 

 

-- যাক গে। রাজার গল্পটা বলো। 

 

-- হম। আরে আমাদের বাবা কাকা, মা কাকীমারা যেমন সব গল্প বলে না আমাদের ছোটবেলা নিয়ে, যেসব গল্প নিজেদের মনে পড়ে না, খালি বড়দের মুখে শুনে বিশ্বাস করে নিতে হয়, এও তেমনই এক গল্প আরকি। আমি নাকি ছোটবেলা থেকেই গল্প বলতে ভালবাসতাম। এটা অবশ্য পুরোপুরি আজগুবি নয়। কারণ স্মৃতি যতটুকু ফিরে যায় বেশ মনে পড়ে, স্কুলে গল্প বলার ক্লাসে ক্লাস ফাইভ-সিক্স থেকেই ডাক পড়ত আমার। তবে এই গল্পটা তার আগের। যখন শব্দগুলো মুখ থেকে সোজাসুজি না বেরিয়ে ডিপ্রেশনের বৃষ্টির মত তেরছা হয়ে আসতো। বাবার এক কলিগের বাড়ি গিয়ে তাঁর বৌ-মেয়ের সঙ্গে গল্প জমিয়েছিলাম। সেই রূপকথার গল্পে পাখীদের রাজ্যে এক শয়তানের অত্যাচার থেকে পাখীদের রক্ষাকর্তা তাদের রাজা আসতে আসতেও এসে উঠতে পারেনি। যে ডিম ফুটে তার বেরোনোর কথা ছিল তা শেষ মুহূর্তে গাছ থেকে পড়ে ভেঙে যায়। আধফোটা ডিমের ফাটল দিয়ে শুধু একটা চোখ দেখা যাচ্ছিলো। যদিও এই গল্পের গল্প আমি বাবা মা জেঠুর মুখ থেকেই বেশী শুনেছি, তাও কেমন মনে হয় একদিন আমার মুখ দিয়েই বেরিয়েছিল এই কথাগুলো। ডিমটা দেখতে পাই এখনো। সাদা পাতার গায়ে নিখুঁত করে আঁকা ডিমের ফাটল বেয়ে স্থির চোখের মণি। গল্পটা কোনদিন খুঁজে পাইনি কিন্তু কি জানো তো, গল্পটা আমায় কোথায় যেন টিক করে গ্যাছে মনে হয়।  

-- আরে এরকম একটা গল্প তো আমারও আছে যেটা আমি কোনদিন খুঁজে পাইনি বড় হয়ে। আমিও মাঝে মধ্যে গল্প বলতাম আমাদের স্কুলে। তা একবার একটা গল্প বলেছিলাম জঙ্গলের ভেতরে এক ওক গাছ নিয়ে। যেটুকু মনে পড়ে স্ত্রী স্বামীর বাড়ি থেকে পালিয়ে জঙ্গলের গভীরে একটা মরা ওক গাছের নীচে প্রেমিকের অপেক্ষা করছিলো। কিন্তু সেরাতে শুধু প্রেমিক আসেনি, এসেছিল তার স্বামীও। মৃত ওক গাছের তলায় মরণপণ যুদ্ধ হয়েছিলো। গল্পটা কোন বিদেশী গল্পের অনুবাদ ছিলো জানো। আমার স্থির বিশ্বাস বাড়িতেই ছিলো অনুবাদ গল্পের বইয়ে। কিন্তু গল্পের থেকেও বেশী যেটা মনে আছে তা হলো ক্লাসে এই গল্পটা বলার পরে আমাদের মিশনারি স্কুলের মিস আমায় একটু আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তিয়া, এইরকম গল্প ক্লাসে বলার নয়। এখনো তোমার এই গল্প পড়ার বয়েস হয়নি’ 

বাস তখন ক্যানবেরা শহর ছাড়িয়ে লেক জর্জের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রনি সিডনী থেকে ক্যানবেরা যাবার সময় বা তিয়া ক্যানবেরা থেকে সিডনী যাবার সময় লেক জর্জের পাশ দিয়ে গ্যাছে সবসময়। চার ঘণ্টার ঐ বাসে ওরা একা একাই গ্যাছে। হয় একে অপরের দিকে আর নয়তো একে অপরের থেকে দূরে। কখনো একসাথে চড়া হয়নি। দুজনেই দুজনকে লেক জর্জের কথা বলেছে। ক্যানবেরা ছাড়ার ঠিক পরে বা ক্যানবেরা আসার ঠিক আগে (সেটা যাত্রাপথের অভিমুখের ওপর নির্ভর করবে) চোখের ডানদিক বা বাঁদিক বরাবর (সেটাও যাত্রাপথের অভিমুখের ওপর নির্ভর করবে) যেখানে বিশাল মাঠ খুলে যায় দিগন্ত জোড়া হাওয়াকলের দিকে, দূরে ছেদ-যতির মত দাঁড়িয়ে পড়ে নীল পাহাড়, সেটাই হল লেক জর্জ। এ এক অদ্ভুত রহস্যময় লেক যা লেক হয়েও লেক নয়। সবুজ মাঠের সারফেসের নীচে জল উঁকি মারে সারা বছর। এই জলাভূমির নাম লেক জর্জ। এখানে আকাশ সমুদ্র আর ডাঙা মিলেমিশে গ্যাছে। সবুজ এই আকাশগঙ্গায় হাঁটতে মানুষকে মোজেস হতে হয় না। দূরে গরুও চোখে পড়ে বেশ কয়েকটা। আরো দূরে হাওয়াকলগুলো হাওয়া থাক আর না থাক, ঘুরেই চলে। দানবীয় দাঁতের মতো ব্লেডগুলোয় সূর্যের আলো আর মেঘ খেলা করে। বৃষ্টির পর রোদ উঠলে আকাশে রামধনু উঠে দাঁড়ালে হাওয়াকলের পেছনে যেন আরো একটা হাওয়াকল দেখা যায়। অনেকদিন ধরেই আসবার তাল করছিল রনি আর তিয়া। এবার রনি ক্যানবেরা আসার পরদিনই মিশন লেক জর্জ। বাস ওদের নামিয়ে দিয়ে চলে যায় আর ওরা রাস্তার ধারের বেড়া টপকে জলাভূমিতে নেমে পড়ে। শীতের মিহি বিকেল। দিনের শেষ ঘন্টাখানেকের সোনালী লাল আলোয় পেয়ে বসেছে লেক জর্জকে। দূরে হাওয়াকলগুলোও অনবরত ঘুরে চলেছে। রনিই প্রথম কথা বলে ওঠে: 

-- এত হাওয়া কোথা থেকে আসে বলোতো?এত হাওয়া দিলে আমি হাওয়ার ভেতর কান্না শুনতে পাই। 

-- কান্নাই তো মানুষের আদিম সঙ্গীত। হাওয়া তাহলে তোমায় গান শোনায় বলো?

-- তা বলতে পারো। হাওয়াকলগুলোকে দেখো?বিশাল বড় পাখার মত একেকটা। 

-- যার ওপর দিয়ে হাঁটছি সেটাই বা কি?জল না মাটি?

-- হাওয়াটা ফিল করো। জলও না, মাটিও না, আকাশ, বুঝলে, আকাশ!

-- আকাশ?বটে? বাতাস থেকে আকাশ বেরিয়ে আসে বুঝি?

-- আসে তবে যতক্ষণ অক্সিজেন থাকে। তারপর গলা বুজে আসে। শ্বাসবায়ু ফুরোয়। মা’র যেমন হয়েছিলো। 

-- রনি, থাক না। 

-- না, থাকার কি আছে? হাওয়াকলগুলো ভালো করে দেখো, তিয়াএকেকটা বিরাট পাখা ছাড়া কি? পাখা তো শুধু হাওয়া দেয় না? অমন একটা পাখা থেকেই তো একদিন...

-- পাখা থেকে... রনি... পাখা থেকে, হাওয়াকল থেকে নয়। এগুলো পাখা নয় রনি, এগুলো হাওয়াকল। 

-- ঠিকই তো। পাখা নয় এগুলো, এগুলো হাওয়াকল। তবে এগুলো পাখা হলে বা পাখা এমন বড়সড় হলে হয়ত মা এত সহজে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারতো না। এত বড় পাখায় ফাঁস লাগানো কি সহজ কথা? 

-- বার বার করে ফিরে গিয়ে ওখান থেকে কি পাও রনি?নতুন কোনো কষ্ট কি আদৌ পাও? পুরোনো কষ্টে মুখ বসে যায় না? চলো আরেকটু এগোলে কয়েকটা পাথর দেখছি। ওখানে বসা যাবে খানিকক্ষণ।

ওরা দুজন এগিয়ে গিয়ে সামনের পাথরখানার ওপর বসে। শেষ বিকেলের ছায়া সরে যায়, ওদের ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় দ্রুত। ওরা ছায়ার নিভু নিভু আলোয় বসে থাকে। হাওয়াকলগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তিয়া নীরবতা ভঙ্গ করে বলে ওঠে: 

-- কেমন নিরন্তর হাওয়া কেটে চলেছে দেখো?কেটে কেটে শক্তিশালী হচ্ছে। শক্তি পেলেই ব্যবহার করে নিচ্ছে। কি আর করবে? মানুষের আজ্ঞাবহ। 

-- আমরা তো দুজনেই ৯০জ বেবি। ওই দশকেই তো হাওয়াকল রীতিমত জাঁকিয়ে বসলো ভারতে, তাই না? 

-- হ্যাঁ। হাওয়ার দশক সেটা। আর NEP. 

-- এসব প্রথম বিশ্বের দেশে নিশ্চয়ই আগেই ছিলো। 

-- তা নিশ্চয়ই ছিলো। তবে অস্ট্রেলিয়া তো প্রায় ৫০ হাজার বছরের পুরনো দেশ। ব্রিটিশরা তো ছেলেমানুষ। এখানে তাদের দৌড় ২০০ বছরের বেশি নয় কাল রাতে নেটে দেখছিলাম লেক জর্জ এক লক্ষ বছরেরও পুরোনো। কি যেন নাম ছিলো লোকভাষায়? দাঁড়াও ফোনে লিখে রেখেছিলাম, দেখছি। 

-- কি মজার ব্যপার না এদেশের অরিজিনাল বাসিন্দাদেরই এখানে ‘অ্যাব-অরিজিনাল’ বলে?কি অ্যাব-নরমাল ব্যপার স্যাপার!

-- হম, পেয়েছি। নাম ছিলো ‘ওয়েরীয়া’, মানে ‘বাজে জল’। ভূগোলের ভাষায় এটা এক ধরণের ‘এনডোরহেইক লেক’ অর্থাৎ এই লেকের জল কোনো নদী বা সমুদ্রে গিয়ে পড়ে না। 

-- এই রে, তুমি তো দেখি আবার ‘ক্লাসে কথা বলতে’ শুরু করলে!

-- ২০০২ সালের খরায় একেবারেই শুকিয়ে গিয়েছিলো, ২০১০ থেকে আবার জল ফিরে আসতে থাকে। 

-- এ যে দেখি গবেষণা!

-- আরে না না, এ হল উইকিপিডিয়া! গবেষণাপত্রে এসব সাইট করা যায় না!

-- হম, বুঝলুম। তা এই জল কোথা থেকে আসে তা নিয়ে কি বলে তোমার পিডিয়া? 

-- সেখানে একটা মজা আছে। লোকবিশ্বাস হলো লেক জর্জ তলায় তলায় পেরু বা দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে জুড়ে রয়েছে। তবে এসবের কোন প্রমাণ নেই। কল্পনার মানচিত্র হয়ত। কিন্তু লেকের জল কখন কিভাবে আসা যাওয়া করে তা নিয়ে রহস্য একটা রয়েই গেছে। 

-- জল তো এভাবেই ঘুরঘুর করে। শরীরের ভেতর, শরীরের বাইরে। কখন কিভাবে আসে, ভিজিয়ে দ্যায় আর কখন কি করে শুকিয়ে ফুটিফাটা করে চলে যায়, কে আর জানে?সব জলের খবর অবশ্য তোমরা ছেলেরা রাখো না!

-- আবার শুরু করলে তোমার ছেলে-মেয়ে! থাক না। জল না থাকলে এখানে চাষাবাদও হয়। যেমন এখন জল কম থাকায় হচ্ছে। 

-- তাহলে হাওয়ার মতই জল। আছে তবু নেই। নেই কিন্তু আছে। তোমার স্মৃতিগুলো যেমন। কেটেই চলেছো, কেটেই চলেছো, যতোই ব্যথা করুক, যতোই রক্ত পড়ুক। 

-- মা আত্মহত্যা করে যখন, তার এক সপ্তাহ আগেই ডাক্তার জানিয়েছিলো ক্যান্সার এবার মাথায় ছড়িয়ে পড়েছে । মা হয়ত আর কষ্ট পেতে চায়নি। আর অপেক্ষা করলে পাখার সঙ্গে নিজেকে বাঁধার শক্তিটাও থাকতো না। হাওয়াও তখন সে শক্তি তৈরি করে দিতে পারতো না। 

-- তাহলে তো বুঝতেই পারছো, রনি। 

-- পারছি কিন্তু তার মাস ছয়েক আগে থেকেই আমাদের বিয়েটাও স্থির হয়েছিলোআর চারটে মাস কি কাটতো না?

-- হয়ত কাটতো, হয়ত কাটতো না। সেটা উনি জানতেন না। তাই হয়ত জানা থাকতে থাকতেই নিজেই পূর্ণচ্ছেদ টানতে চাইলেন। ডাক্তার কিন্তু আশ্বাস দিতে পারেনি আরো চার মাসের। 

-- আসলে কি বলতো, মার শেষ বছরটা শুধু স্কাইপেই দেখলাম মাকে। ছবির মত। এখন যেমন আমার ঘরে এক ছবি হাসি হয়ে গ্যাছে। যেদিন ফিরলাম, এয়ারপোর্ট থেকে সোজা মর্গ। লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মর্গের চাবি ঘোরাচ্ছিলো। স্কাইপ থেকে কর্পস। মাঝে কিছু নেই। 

-- হয়ত উনি চাননি আমাদের বিয়েটা ওনার জন্য শেষ মুহূর্তে না হোক। শেষ ছ’মাস ধরে সারাক্ষণই তো ওই বিয়েরই তোড়জোড় করেছেন কাকীমা। 

-- হ্যাঁ। বিয়েটা মাকে দেখানোর জন্য এগিয়ে আনা হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে ক্যান্সারও এগিয়ে এলো। দেখতে দেখতে প্রায় দুটো বছর হতে চললো, আমি যেন এক নারী থেকে আরেক নারীর কাছে হস্তান্তরিত হলাম। চার মাস আগে পরে।

রনি আর তিয়া যখন জীবনের কথার অছিলায় এভাবে মৃত্যুর লেনদেন বুঝে নেবার চেষ্টা করছিলো, তখন আকাশ জুড়ে সূর্যাস্ত। হাওয়াকলের দাঁত ভেদ করে লাল আলো দিগন্তের ভেতর সেঁধিয়ে যাচ্ছে চোখের পলকে।

।।এবার আমি ওদের ভাবাব।।

ওরা দূরে দেখবে কয়েকটা লোক গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছে। ওরা কি নগুনাওয়াল উপজাতির মানুষ যারা ছিল এই ক্যানবেরা এলাকার আদিম বাসিন্দা? ওরা কি এখন আর আদৌ এখানে আছে নাকি সরতে সরতে হাওয়ায় মিলিয়ে গ্যাছে। ১৮২৬ সালে এই লেক জর্জেই ওরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সভা করেছিল ক্যানবেরা অঞ্চলের অধিগ্রহণ নিয়ে। পরে ক্রমেই আরো ভেতরে ভেতরে চলে যায়। এই জলের মত, এই হাওয়ার মত কখন আসে কোথায় যায় কোন চিহ্ন রাখে না। ওদের কোন’নেশন’ নেই। শুধু ‘ল্যান্ড’ আছে, আছে ‘কান্ট্রি’। ওরা বিশ্বাস করে স্বপ্নসময়ে যেখানে কেউ কোনদিন চলে যায় না, হারিয়ে যায় না। হাওয়া হয়ে থেকে যায়, জল হয়ে রয়ে যায়, আসা যাওয়া করে। পেরু বা দক্ষিণ আফ্রিকা না হলেও সেই অস্ট্রেলিয়ান ল্যান্ডের সাথে এই অস্ট্রেলিয়ান নেশনের যোগসূত্র এই লেক জর্জ। কান পাতলে এই মাটি থেকে নানা অজানা ভাষার ক্রন্দনসঙ্গীত শোনা যাবে। রনি আর তিয়া চুপ করে আধ-ঘণ্টা শীতার্ত অন্ধকারে বসে থাকলে যখন অন্ধকার জল-স্থল অন্তরীক্ষের বর্ণবৈষম্য ঘুচিয়ে দেবে তখন ওরাও মাটির নীচের সেই মৌনরব শুনতে পাবে।

।।আমি ওদের শোনাবো।।

।।আমি এই জলার প্রেত।।

।।আমি বলালে তিয়া রনিকে বলবে:

-- জানো তো ১৯৬৭ সালের আগে সাহেবরা অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের ‘ফ্লোরা আর ফনা’ ভাবতো।  আমার তো মনে হয় ঠিকই ভাবতো। সত্যিই তো ওরা এই মাটিতে মিশে আছে, ঐ দূরে হাওয়া কেটে চলেছে। 

-- ওরা জলার প্রেত। মনে আছে আমাদের ছোটবেলায় দূরদর্শনের জমানায় যখন আদ্যিকালের ছবি দেখাত, তখন সেই ‘কুহেলী’ ছবিটা? তখনও ইস্টম্যানকালার আসেনি। 

-- তা আর মনে থাকবে না! সে তো সুপারহিট ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট। আর সেই বিখ্যাত গান: ‘এসো এসো কাছে এসো।’

-- আরেকটা ছিলো, লতার গাওয়া, ‘আসছে সে আসছে।’

-- আসছে তো বটেই, রনি, দূরে দেখো, শেষ আলো জ্যোৎস্না হতে না হতেই ওরা আসছে। 

-- আসবেই তো। মাথার ভেতর আক্রমণ হবার আগেই আসবে, পাখা ধরে ঝুলে পড়ার শক্তি থাকতে থাকতেই ওরা আসবে, সে পাখা থাক আর নাই থাক। হাওয়াকল বাতাস কাটবে। জল আসবে, জল চলে যাবে কিন্তু আবার কোন একদিন ফিরে আসবে।