গল্প : বারীন ঘোষাল

অরূপের রূপকথা

এতরকমের বাস্তব দেখেছি জেনেছি ভেবেছি যে আজ সবকিছুই অবাস্তব মনে হয়। অবাস্তব অনেকরকমের হতে পারে, কিন্তু বাস্তব যে প্রতি মানুষের আলাদা ব্যাপার সেটা বুঝতে অনেকদিন চলে গেল। আমার বাস্তব আছে, তোমারও আছে, পাশেই আছে টোটোদের বাস্তব, একটু দূরে জারোয়াদের বাস্তব, আরও আছে জঙ্গলমহলের বাস্তব, মাওবাদীদের বাস্তব --- কতরকমের --- কিছুই ফ্যালনা নয়। মন্দির থেকে বেশ্যাবাড়ি সব টুকরো টুকরো, ডাইনামিক কোলাজ, ক্যালাইডোস্কোপে দেখা --- দেখাই তো --- স্পর্শে নয় --- বোধে নয় --- যেন জীবনের অঙ্গে প্রোথিত, প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, আমার জীবনে, আমার খামখেয়ালিতে --- আমারই উদ্ভট কল্পনায় -- আমার ফ্যান্টাসিতে --- জীবনের গল্প নয় সে সব গল্পের জীবন --- বাস্তব হয়ে যায় অবাস্তব --- আর অঘটিত সম্ভাবনাগুলো হয় বাস্তব --- যাদুই বাস্তব --- ম্যাজিক রিয়ালিজম --- তা কোন ম্যাজিক করে না --- সে সবের অস্তিত্বই ম্যাজিকের মতো --- তৈরি করি আমি আমার ফ্যান্টাসিতে ---- একটু একটু করে সিন ক্রিয়েট করি ---

ছেলেটা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। তার শরীরের দুপাশে দুই পা রেখে মুখোমুখি মেয়েটা।

ছেলেটার বাঁ হাতে তুলে ধরা এক টুকরো পাউরুটি। মেয়েটার ডানহাত সেদিকে বাড়ানো। মধ্যে ছ’ইঞ্চি ফাঁক। মেয়েটাকে ঝুঁকতে হবে।

ছেলেটার লম্বা চুল মাটিতে এলানো। মেয়েটার উসকোখুসকো ছোট চুল বাঁ হাতে সামলানো। একটু হাওয়া।

ছেলেটা পরনে হাফপ্যান্ট। মেয়েটা উদোম। হালকা ভোর। সবে শীত।

ছেলেটা সবে দশ। মুখে হাসি। কথা নেই। মেয়েটা সাত বা ঐ। মুখে হাসি। কথা নেই।

ছেলেটার ডান হাট মেয়েটার নুনুতে ফিরছে। মেয়েটার ডান হাট একটু একটু করে পাউরুটির দিকে এগোচ্ছে।

ছেলেটার মাথা বড় রাস্তার কাছে। মেয়েটার পিছনে রাম মন্দিরের দেয়াল। প্যানেলে বাবা-ছাপ তাম্বাকুর বিজ্ঞাপন।

ছেলেটা যৌনতা শেখেনি। অভিনয় করছে। মেয়েটার যৌনতা নেই। অভিনয় করছে।

ছেলেটা কাউকে দেখে শিখেছে। মেয়েটা কাউকে দেখে শিখেছে।

ছেলেটা খেলছে। মেয়েটা খেলছে না। তার খিদে পেয়েছে । রুটি চাই।

ছেলেটা কখনো শিব হতে পারবে না। মেয়েটা কখনো কালী হতে পারবে না।

ছেলেটার মাথায় কখনো চাঁদ আসবে না। মেয়েটার চোখে কখনো জল আসবে না।

আমি স্টেশনে যাচ্ছিলাম অটোয় চেপে। দৃশ্যটা পেরিয়ে গেল। ট্রেনে না উঠে আমি ফিরে এলাম। পরদিন ঐ সময়ে আবার সেই অটো চেপে ঐ জায়গা পেরোলাম। এক দৃশ্য। মেয়েটার হাট রুটি ছুঁই ছুঁই। তাহলে কালকের রুটিটাও সে পেয়েছিল। পরদিন আবার। ওরা নেই। অটো চালককে দাঁড়াতে বলতে পারি না। ঐ দৃশ্য বা দৃশ্য- হীনতা শব্দহীন হতে বাধ্য।

পরদিন ছেলেটা উঠে বসা। শূন্য দৃষ্টি। মেয়েটা রুটি খেতে খেতে চলে যাচ্ছে।

পরদিন। এবার তিনটে ছেলে শুয়ে আছে। একই চেহারা পোশাক বয়স। তিন জনের হাতে রুটি। মেয়েটা এগিয়ে এসে আগের ছেলেটার ওপর দাঁড়ালো। প্যান্টের রঙে চেনা গেল।

কচি মেয়েটা চেনা ছেলেটাকেই বাছলো। দুজনের হাতের বাকি রুটির কী হবে ? বাকি দুটো ছেলের ডান হাতগুলো কী করবে ? এখন থেকেই কি পরিবারের চেতনা শুরু হল ? এসব দেখলাম যেতে যেতে। কিম্বা হয়তো বানালাম। ফ্যান্টাসি বলতে পারো। গল্প নয়, একটুকরো যাদু বাস্তবতা দেখতে পেলাম বা তৈরি করলাম। এর আগে কেউ দেখেনি। চারদিন পেরিয়ে ট্রেনে চাপলাম শেষ পর্যন্ত।

মোনালিসার কাছে পৌঁছে দেখলাম বেশ রেগে। চারদিনের কামাই। গায়ে হাত দিতে জল হল না বরফের আগুন। ঝামটা খেলাম। মুখ খোলা মানেই মিথ্যে বলা। যে শুনবে তাই ভাববে। সত্য কথা কাউকে বলার নয়। প্রত্যেকেরই আছে নিজস্ব সত্য মিথ্যা।

ব্যাঙ্কের ভাল চাকুরে। বেশ দেখতে। মাঝবয়েসী। সিঁদুর পরছিল। গোপনে। গুপ্তস্থানে। কেৎরে গেল। সে নিপুণ নয়। নিপুণ মেয়েরা সবচেয়ে প্রথমে নিজের সাজসজ্জা সামলে নেয়। কী করবে। অনেক কিছু বলতে গিয়ে হাত মুখ নড়তে থাকল। আমার টেপ রেকর্ডার নেই। নিদেন মোবাইল। মেন্টাল শর্টহ্যান্ডও জানি না। বধির হয়ে যাওয়া ভাল। শান্ত হতে সময় লাগবে। আমার প্রচুর। ওর অভাব। কথায় কথা বেড়ে কাজের সময় বয়ে গেলে আরও রেগে যাবে সে। মোনালিসার ঠোঁট একটু বড় আর মোটা। মেয়েদের মুখের ঠোঁট আর যোনির ঠোঁট সমানুপাতিক হয়। তাই পরম সুখে আফ্রিকানদের একপাল বাচ্চা হয়, আর স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় ছেলেপুলেই হয় না। যৌনতা জাগাবার জন্য তাই ওদেশে ব্লু ফিল্ম খুব চালু। তারাই নাকি পৃথিবীর গ্রেট সাপ্লায়ার।

আমার মনের গতিবিধির আঁচ না পেয়ে, এতক্ষণে বিরোধী বা স্বপক্ষের কোন ওজর না ওঠায় সে থামল। তার হাত পা মুখ নাড়াবার কেঅসের মধ্যেও কি একটা নাচের তাল ছিল না ? মোনালিসা এককালে নাচ জানত। যে নাচ কন্টিনিউ করে না তাকে বাতে ধরে। নাচ বোধ হয় একটা ফেমিনিন ব্যাপার। যে ছেলেরা নাচ শেখে তাদের ভাব ভঙ্গী চাল চলন ফেমিনিস্ট হয়ে যায়। মেয়েরা মেয়েদের মতোই থাকে। মেল শওভনিজমের চেয়ে ফেমিনিনিটি অনেক ভাল। ছেলেরা ব্যাপারটা টের পেতে অ্যাক্রোবেটিক্স শিখে ফেলেছে। অ্যারাবিক্স শিখছে। ধ্রুপদী নাচের লাবণ্য বদলে যাচ্ছে ঝম্পতালে। তাতে আমার কী ? অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম আমার অ্যাবসেন্টমাইন্ডেড চোখের দিকে তার কড়া দৃষ্টি। মোনালিসার হাতের ইশারায় ফ্রিজ রান্নাঘর দরজা বাথরুম বুকশেলফ্ এসব বোঝা গেল এতক্ষণে। সে বেরিয়ে গেল। অফিসে। আমার বউ।

এটা আমার গল্প নয়। আমার বাস্তব আমি দেখতে পাই না। আমি মোনালিসার বাস্তবও দেখতে পাই না। শুধু তার বাস্তবতাটুকু, তার অস্তিত্ব ঘোষণার চেষ্টাটুকু দেখতে পাই। এটা আমার তৈরি যাদু-বাস্তবতা হতে পারে। আমার ফ্যান্টাসি। তা যে সুখ গরম হবে না, নরম হবে না, উপাদেয় হবে না, বাজারে হবে না --- কে জানে !

জামশেদপুরে আমার বাড়ি। কাজকর্ম উপার্জন। ইচ্ছে করে মোনালিসার ওয়ার্কপ্লেস চেঞ্জ করার চেষ্টা ফাঁসিয়েছি। এখন আমার দুটো ঘর। মোনারও।

চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। তাওয়ে তাওয়ে। ভাল লাগছিল না। ভি আর এস লিস্ট দিতে বললে নিজের নাম গোড়ায় বসালাম। আলোচনা করিনি বলে মোনার রাগ। অনেক সময় হাতে এখন। মোনা অফিসে।

অ্যালবামের বাক্স খুললাম। একের পর এক সবগুলোতেই মোনা। আমার ছবিগুলো কেটে ফেলা। কেটে সরানো। কখন কোন আবেগে কেটে ফেলেছে। এবং আমি দেখতেও পারি। কোন লুকোছাপা নেই। হয়তো রোজ বা কখনো সখনো বা কখনো না, সে শুধু তার ছবিগুলো দেখে পাঁচ মিনিট পঞ্চাশ মিনিট বা কখনো না। আমার ছবিগুলো ফেলে পুড়িয়ে বা লুকিয়ে বা এমনি ক্যাজুয়ালি কোথাও সরানো। আমার কোন এভিডেন্স থাকবে না। এত ভাবছি কেন ? নিজের মুখোমুখি হবার কথা কখনো কি ভেবেছি -- একমাত্র আয়নায় বাঁ হাত চুল আঁচড়াচ্ছে সিনটি ছাড়া ?

ঐ লোকটাকে ভালবাসি। লোকটা আমার রাইভাল না। ও আমার থেকে কখনো কিছু কেড়ে নেয়নি।। আমাকে নকল করেছে হামেশা। ভালোপাহাড়ে চলে গিয়েছিলাম। একদিন রাতে ভীষণ ঝড়বৃষ্টি হল। সবকিছু ভেঙে ডুবে গেল। পথ উপড়ে গেল। ব্রিজ দু-টুকরো। বাঁধে ব্রিচ। টেলিফোন ডেড। ট্রাফিক বন্ধ। মা মারা গেল। আমাকে নেবার লোক আসতে পারল না। মাকে নেবার লোক আসতে পারল না যমলোক থেকে। মর্গে বর্ফি মা নিজেই আইসক্রিম হয়ে গেল। আইসক্রিম খেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে লোকটা আমার সঙ্গে কাঁপতে কাঁপতে কাঁদলো। আমার ক্যাসেট প্লেয়ার চুরি হয়ে গেল। এখানে ভোরের ফুটফুটে মোরগটা আমার বানানো। তাই এত সহজে কারো মা মারা যায়।

ট্র্যাশ।

ফ্রিজ খুললাম। রান্নাঘর সার্চ করলাম। দরজা বন্ধ করে বাইরে এলাম। আকাশে অনেক ঘুড়ি। নানা রঙের নানা হাতের সাইজ হাইট সুতো লাটাই রং লেজ কেউ লড়ছে কেউ উড়ছে না শ-খানেক ঘুড়ি কেঅস প্যাটার্ন বা ননপ্যাটার্ন সিস্টেম নেই অবিন্যাস এত ভাল লাগে কেন – তাও দূর থেকে ? এই প্রথম কোয়েশ্চেন করলাম। কাউকে না।

আজিনো মোতো, ক্যাপসিকাম, আমচুর কিনলাম। একটা বাকার্ডি পাঁইট। এক প্যাকেট উইলস্। এক প্যাকেট গ্রাস। ছোট শহর। ননডেস্ক্রিপ্ট। রাস্তায় উপচে পড়া। তবু পেলাম। জামশেদপুরের চেয়ে দাম বেশি। মোনালিসার কোন পুরুষ বন্ধুর চিহ্ন নেই কেন ?

শহর ছাড়িয়ে জায়গাটা বেশ সুন্দর। কোন মাপজোক ছাড়াই। সুন্দর বিচার করতে হয় না। সিদ্ধান্তে মুহূর্তের বেশি লাগে না। কী করে হয় ? কোন অঙ্ক ছাড়া – এবং বর্ণনা করতে গেলে মাল ছড়িয়ে পড়ে। সুন্দরের বর্ণনা কোনদিন মোনালিসাকে ছাড়ালো না। আমি সুন্দরকে সন্দেহে কমিয়ে ‘বেশ’ বলি। দেখি সবাই সব জায়গায় আছে সেজে গুজে। ঠিক সময়ে ঠিক কথা বলছে। গুলি চালাচ্ছে। ভাষণ দিচ্ছে। পার্কে সকালে কোন জোকস্ ছাড়াই স্ত্রী পুরুষ কণ্ঠে সমবেত হাস্যনাদ হচ্ছে। হাস্যরোল হবে কি ? রডোডেনড্রনটা – না দুটো পূর্ণচাঁদ ভরাগুল খিলিয়েছে। চাঁদ তো এখন মিথ্যা হল। কাউকে বলিনি তো। ওপরের দিকে ল্যাটিচুড হয় না লঙ্গিচুড – গগল্স পরা সূর্য – যদি – আমি ফিরে এলাম রিকসোয়।

লুড়িটা খুঁজে না পেয়ে – ওটা বাংলায় নোড়া – আগেকার ভাঙা ব্যাকটিরিয়ার শিল টুকরো দিয়ে বর্তমান শিলে সর্ষে বাটা-মাছ – এবং যা ছিল যা এনেছি দিয়ে তরকারি ডাল ভাত রাঁধলাম – নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে ন্যাংটো হয়ে রান্না করার আনন্দ মেয়েরা পেল না হায় !

আমার প্রবলেমটা হল --- লিভার কতটা খারাপ জানি না। মদ কতটা খাব কোথায় থামব বুঝতে পারি না। পাঁইট ফুরোবার পর সারা ঘরে খুঁজে ফিরি পরশপাথর। দুটো উইল্সের তামাক খুলে গাঁজা পাঞ্চ করে টান মেরে একজস্ট চালিয়ে দিলাম।

এসবের মধ্যে কোন বাহাদুরি নেই, কোন চালাকি নেই। পারাপারি নেই, জাস্ট যা পারি আর পারি না। চান করে নিলাম। রুম স্প্রে। সফ্ট্ মিউজিক অর্থাৎ রবীন্দ্রসঙ্গীত --- আমার মার ক্যানসার ছিল বুকে --- যেখানে আমি দুধ খেয়েছিলাম --- ভাল মন্দ জানি না --- বাবাকে নয়, মাকে আমি ভালবাসতাম। তার লাশ নিতে এসে মোরগ দেখেছি। এই ফিলিং-এ রবিবাবুর বদলে বেগম আখতার সিদ্ধ ছিল। তার একটা নতুন সিডি বেরিয়েছে --- সোনি মিউজিক করেছে --- কী যেন নাম --- কে বলল।

চান করে এসে পাউডার স্প্রে লাগিয়ে পাজামা পাঞ্জাবি পরে পুজোয় বসলাম – হোয়াট – টেবিল সাজিয়ে অপেক্ষা করলাম মোনার --- খাবারের প্রথম প্লেটে একটা ফুটো করা ডিউরেক্স। --- তোমার কিছু এসে না গেলেও আমার লজ্জা করে শুনতে যে এত বয়সেও একটা বাচ্চা নেই কেন – বুঝি না – একদম বুঝি না তার হোঁঠজ্ঞান – কী বলতে চাইছে মোনালিসা – না-কথায় এটা কীভাবে বোঝানো যায় – আমিই বা।

মোনালিসা ফিরে এল প্রায় লাঞ্চ পেরনো সময়ে। ভেতরে এসে কাঁধব্যাগটা ছুঁড়ে ফেলে শুয়ে পড়ল লম্বা হয়ে ডাইনিং টেবিলের পাশে ডিভানটায়। আমি আলো জ্বেলে ফ্যান ছেড়ে তার চরণজুতো খুলে হাত ধুয়ে রান্না করা সব ডিশ কাছে এনে ওর পেটের দুপাশে হাঁটু গেড়ে বসলাম। চোখে পার্থিব জীবনের সমস্ত ভালোবাসা প্রেম করুণা দয়া মায়া মমতা স্নেহ মোহ করুণা মোহ – রিপিট হচ্ছে ? খাও মোনা এই চোখের জল, হৃদয়ের উত্তাপ, মিস্টি মিস্টিক চরিত্র – কাঁটা বেছে রেখেছি মাছটুকু, আর একটু প্লিজ, আর একটু ভাত -- পেটে লাগছে ? লাগছে কিনা বলো।

ব্যাকগ্রাউন্ডে তখন লোডশেডিং কোন কাজ করল না।

রূপক বলে মনে হল কিছু? যদি সত্যি সত্যি দৃশ্যগুলোকে ফলো করা যায়, এবং মনে থাকে আইসবার্গের চোটির কথা – তবুও সেখানে হাত পা যায় না – কোন অসাধ্য সাধন নয় – যা ছিল না – একটা নতুন বাস্তবতা তৈরি করার মজা, ম্যজিক – ম্যাজিক বাস্তবতা যা নিজে নিজে হয় না – আমি তৈরি করলাম – কোন রূপকথা নয়, নয় কোন কিংবদন্তীর ডালপালা – তাহলে মোনালিসা – নিজের নিয়মে বাড়ুক না চন্দ্রকলায় শুদ্ধ চাঁদ – দু-একটা কলঙ্ক – শিউরে উঠে -- রামকে মরা দেখতে পেয়ে – একবার মাত্র।

জীবন হল সম্ভাবনার ব্যাপার। ত্বরিত কোরো না। নিজে থেকেই হোক। বীজ পুঁতে যাও। নো ডিউরেক্স। তাতে বিস্ময় জেগে থাকে। বিস্মিত হবার আনন্দটা নির্মল। এই যে চারপাশে সবকিছু হয়ে যাচ্ছে, যা চাইছি করতে পারছি না, না চাইতেও কত কিছু হচ্ছে – অবাক লাগে না ? যেন ছোট একটা বাগান, একটা নিজস্ব ল্যাবরেটোরি – নিজের মতো করে একটা গর্ভ – চারপাশে এত কেঅসের মধ্য দিয়ে নড়বড়ে জীবনটা এগিয়ে চলেছে – ভাবো – ফিল করো মুহূর্তগুলো – জলগুলো – সমস্ত রিয়াল টাইম কর্মকাণ্ডের মধ্যে তুমিও আছো আর অবাক হচ্ছো।

কথা বলার কী দরকার। অরূপের রূপকথার পাতা হৈ হৈ ওড়ে। সেই লোডশেডিং। আমি হাওয়া দিই খুব। অনেকের মধ্যে ঐ একটা পাতা উড়তে উড়তে খুলে যাচ্ছে যাতে শুধু ছবি আঁকা। পত্ঝর শুরু হল কি ? হাত বাড়িয়ে খপ করে একটা পাতা ধরে ফেলি। খুলে দেখি --- একটা গর্তের হাঁ-মুখে অজস্র রঙিন জল গাইতে গাইতে কলরোল করে ঢুকে যাচ্ছে। জলেরা হারিয়ে যাচ্ছে। পাতার তলা দিয়ে বেরিয়ে আসছে না। কি করে হয় ? আরো একটা পাতা ধরলাম খপ করে, সাবধানে যাতে হাতের চাপে গুঁড়িয়ে না যায়। আরামে টেনে সোজা করে দেখি একটা গর্ভ উন্মোচন হচ্ছে, দৃশ্যটা মধুর এবং রঙিন। শুধু পা। পা দেখে কাউকে চেনা যায় না। না প্রসূতিকে না প্রসূতকে। পাতায় পাতায় অরূপের জাদুকর মন। একটা পাতায় আলপনার ‘প’ কাটা – বোঝা গেল খালি স্ট্রাকচারের তলায় গাদা গুচ্ছ কাপড় চোপড় দেখে, একপাশে লাগা আগুন – এগোচ্ছে না – হাওয়ারা অবাক । আরো কয়েকটা পাতায় মোনালিসার ছবি, দোলের ছবি, কান্নার ছবি, একটা পাতা পরিষ্কার করতেই ফুটে উঠল ক্রন্দন – মা না সেটা শিশুর – বোঝা গেলো না। ক্রমশ চনমনে -- এটা অরূপের না মোনালিসার রূপ-বাস্তবতা –- যে যাদুরূপের লাস্ট সিনে দেখা যাচ্ছে মোনালিসা বাচ্চা মেয়েকে বকতে বকতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে স্কুলের বাসে তুলে দিয়ে তারপর অরূপের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া আখেরকে খিস্তি করতে করতে ছিটকিনি দিচ্ছে।

তাদের দরজার বাইরে ঝুলছিল একটা প্লাস্টিকের পাউরুটি রঙ মাখানো। দোলের নয়, দোলনারও নয়।