সমালোচনা : সোমাভ রায় চৌধুরী

প্রসঙ্গ: ক্লাউনের ডার্করুম

একজন প্রকৃত কবিকে চিনিয়ে দেওয়া সহজ কথা নয়। কিন্তু, ঔরশীষ ঘোষের “ক্লাউনের ডার্করুম”- ৩২ পাতার একটি বোমা- বিশেষ। কবি – বয়সে নবীন হলেও, তাঁর কবিতারা গভীর প্রাজ্ঞ চোখে জীবনকে দেখে। অত্যন্ত সহজ ভাষায় তারা একটি জীবনকে সনাক্ত করে। চিহ্নিত করে প্রাচীন মিথ থেকে সমকালকে। এত অল্প বয়সে কবি কিভাবে আয়ত্ত করেছেন তাঁর নিজস্ব সাক্ষরের ভাষ্য, আয়ও করেছেন এক ঘোলাটে কবিত্বের বর্তমানকে, তা খোদায় মালুম!ম্যাজিক আছে তাঁর শব্দচক্রে, তাঁর কলমে। আমি জানিনা, বর্তমানে, কতজনের হাতে এই গ্রন্থ পৌছবে, তবু কবি রয়ে যাবেন পাঠকের মরমিয়া মননে। বহুকাল।

কবি নিজেকে “প্রান্তিক মানুষ” হিসেবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে চান। তার রূপান্তরিত ভাষায়। তিনি কোনও অভিযোগ, অনুযোগের জায়গা রাখেননি গ্রন্থের গোড়ার থেকেই। “ছদ্মবেশ” আর “পরিধান” এর মাঝে যে শাশ্বত চক্র কাজ করছে তা তিনি জানান দিচ্ছেন বইয়ের প্রথম কবিতার “আহ্লাদ নদী”-তে ভাসতে ভাসতে। প্রেমিকা বা ঈশ্বর “ব্যক্তিগত” কিনা, এ প্রশ্ন তাঁর মনে “লুকনো চিঠির মতো” উঁকি দিয়ে যাচ্ছে। শামুকের ন্যায় এই জীবনকে কবি ধিক্কার দিচ্ছেন। তাই তিনি ছিঁড়ে ফেলছেন “পাথর মলাট” আর আবিষ্কার করছেন “তোর্সার নরম মাংস খুঁড়ে লুকনো বিয়ার”।অদ্ভুত তার দৃশ্যকল্প নির্মাণ, যেমন, “সবুজ কুয়াশা”, “হলুদ চাঁদের আলো”, “পশম ভোরের পাখি” (দ্বিতীয় কবিতা: অভিসার - ১) ইত্যাদি। কজন কবি লিখতে পারেন –

“মেঘের খোলস ছিঁড়ে

উন্মাদের কাঞ্চনজঙ্ঘা

ফুলস্কেপে,

রোপওয়ে থেকে ঝাঁপ দিয়ে

পাখির স্বভাব পায়

ছাইরঙের যুবক ” ( তৃতীয় কবিতা: অভিসার – ২)

যিনি পারেন, তিনি কোনও ‘ঔরশীষ’-ই হবেন। যিনি পারেন তাঁর ডাকনাম ধরে ডাকলে সহমত তিনি একসঙ্গে পুড়তে। অর্থাৎ কবিতার সঙ্গে সহমরণে যেতে। প্রতিবারই তিনি তাঁর অস্তিত্ব হারান আরেক পাসপোর্টের জন্য। তাঁর “অনিশ্চিত রাত কাটে দোটানায়”। সাপের মত তিনি হাইবারনেশানেও যান।

সারসও মাতাল হয় কবির দৃপ্ত কলমে। তাঁর “হোটেল” “মস্ত নিরামিষ” , যার “এঁটো থালা বাসনেও ডুমো মাছিদের ভিড়”। কবি হারিয়ে যান বিমর্ষ প্রেতলোকে। পাখিরাও গেয়ে ওঠে “অশ্লীল গান”। “মন্থন” তাঁকে সুখের থেকেও বেশি অনর্থক যন্ত্রণা দেয়। “পুরুষের মানুষের প্রেম” হারানো পয়সার মতো দৈবাৎ কখনো খুঁজে পান তিনি। কবি “মাটি কামড়ে শুয়ে থাকে আত্মবিস্মরণে” এবং “প্রাচীন মূর্তির মতো” উল্লসিত, চাটতে থাকে “পুরনো ছদ্মবেশ”।

একটি বিশেষ পংক্তি থমকে দিল আমাকে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলাম। “নেশার মতন মনে হয় ; নেশার মতন না”। এমন লাইনের অপেক্ষায় একজন কবি আজীবন অপেক্ষা করেন। ঘুমের মধ্যে তাকে সুগন্ধি তাড়া করে, এ যেন এক ( কবির ভাষায়) “নির্জন প্রশ্রয়” । এই কবিতাতেই তিনি কেমন সহজে টেনে আনেন দৈত্যের বাগানের নির্দয় বিলাপ। আমি জানি না কিভাবে কবি লেখেন – “ যদিও জলের শরীরে ছায়া পড়ে না”...!!!

“রাতের পিকাসো”, একটি মনে রাখার মতো কবিতা। আদ্যন্ত মেটাফিসিক্যাল। কবির প্রেমিকাকে ঘৃণা যোগায় দুটি ‘ম’কার। আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গম ঘটেছে এই কবিতায়। গণিকা ও বণিকের অবিশ্রান্ত চিত্রকল্প চমকে দেয় পাঠককে। এখানে মিলে গেছে জন্ম ও মৃত্যু একটি আধুলিতে এসে। যেন তারা একই কয়েনের এপিঠ ওপিঠ। খানিক রোম্যান্টিসিজম যে ছোঁয়নি এই কবিতাকে তা বলব না। কারণ, চাঁদের সঙ্গে বেশ্যার তুলনা টানছেন কবি। মুছে যাওয়ার দলিলে ধরে রাখছেন সময়কে। কবিতাটির শেষ পংক্তি পাঠক ভুলতে পারবেন না; “ মড়কের দেশে তারা ঈশ্বরের শুক্রাণু ছড়ায় ”।

পরের কবিতার প্রথম পংক্তিটিই চমকপ্রদ, “প্রতিদিন কাটে এমন প্রতিদিনের অনুবাদে”। মৃত্যুকে কল্পনার স্তরে নিয়ে যাচ্ছেন কবি। কবিতার নাম – “ মৃত্যু , অসুখ ও ফ্ল্যাশব্যাকে আত্মহত্যা”। এখানে রোম্যান্টিকতা ও মিথের মিশ্রণ কবিতাকে এক ভিন্ন মার্গে নিয়ে যাচ্ছে। হেমন্তের ভুবনডাঙ্গার ঘাস থেকে কবিতা হেঁটে যাচ্ছে ঘুমন্ত সক্রেটিস ও প্রমিথিউসের চৌর্যবৃত্তিতে, যার ফলে আমরা নিয়ত পুড়ছি স্বর্গীয় অগ্নিতে , পরিশুদ্ধ হয়ে উঠছি। মৃত্যু, সংক্রমণ ও পেরেক আমাদের ঠেলে দেয় অবান্তর বিবাদে। ভৌতিক পরিচালক গোপন ক্যামেরায় তুলে রাখেন ব্যক্তিগত দৃশ্য, সান্ধ্য দৈনিকের মতো- যা ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়, আর কবি লিখে রাখেন, “ আমার চোখের সামনে প্রতিটা মৃত্যুই হয়ে ওঠে আত্মহত্যা”।

পরের কবিতা “ পাঁচমেশালি নয়নতারা” নামটি নিয়ে এমন মরবিড কবিতা লেখা যায়, তা পাঠকের কাছে অকল্পনীয়। কবিতা শুরু হচ্ছে নয়নতারার অন্তর্বাস দিয়ে। প্রসূতি ভবনে শুয়ে আছে নয়নতারা। এই ভাবনা নিয়ে যে- “মৃত শিশদের জন্য কাঁচঘর /আর মৃত মায়েদের জন্য নাচঘর/প্রস্তুত রেখেছে তারা”। এই চিন্তা তার মস্তিষ্কে গেঁথে দিয়েছে কিছু নার্স যার প্রস্তুতি তারা নিজেরাই করে দিয়েছে। “তর্ক সাপেক্ষ যা কিছু” কবি তা বাসের জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছেন। তার পক্ষে প্রত্যেক নারীর মুখ মগজে জমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। নারীদের নাম, বুকের সাইজ আর কোমরের খাঁজগুলো কাটাকুটি হয়ে গেলে বাস থেকে নেমে সবার দৃশ্যমানতার বাইরে চলে যায় “নয়নতারা”। কারণ কবির পক্ষে বোঝানো অসম্ভব যে তিনি নয়নতারাকে কতটা ভালবাসেন। মাছের আঁশটে গন্ধের মতো, কিন্তু শিরায় ধারালো ব্লেডের মতো নয়, কবি টের পান নয়নতারার শরীরের ঘ্রাণ। কবি নয়নতারার ব্লাউজের বোতাম খুলতেই চলে যান death trip- এ।

যদিও চাঁদের শাসন নেই, তবুও শরীর আগুন হয়ে ওঠে অচেনা পাড়ায়; বাতাস যেখানে “no entry” বোর্ড হয়ে দাঁড়িয়ে। যেখানে “পারদ চড়ায় সন্ধ্যার লিরিকে গলিঘুঁজি অন্ধকার”। কান ও চোখ আছে যেখানে দেয়ালেরও। নারকীয় অন্ধকারের মরবিড মুহূর্তে কবি হারিয়ে যান জেব্রা ক্রসিং-এর রুলটানা বিভ্রান্তিতে। টাইম টেবিল বাতাসে উড়িয়ে কবি ছুটছেন; উদ্ভ্রান্ত। “বাতাস ওড়াচ্ছে ঘরময় নয়নতারাকে... পাশবালিসের তুলো মেঘ ভাসতে থাকে মৌসুমি বাতাসে”—“পাঁচমেশালি নয়নতারা” কবিতাটি আমার মতো পাঠকের কাছে একটা মাস্টারপিস। ভুলতে পারা বড় কঠিন।

“নিরুত্তাপ” কবিতাটিতে ব্যক্ত হচ্ছে জীবনের তাৎক্ষণিকতা বা “futility of life”। যেমন , আঙুলের গিঁট খুলে পাখিদের উড়ে যাওয়া বা সুরা পানের সুবাদে আড্ডার ঠেকে শব্দদের পুড়ে। যেসব মাছেরা সন্তরণে পারদর্শী করত কবিদের তারাও মরে পচে যায়; তাৎক্ষনিকতায়। জীবন কবির কাছে, সহজ ভাষায় ধরা দেয়। দৃশ্যমান হয় মাদকাচ্ছন্ন ভাষায় “শিশুর কবর”। প্রেমিকার সাথে ইয়ার্কিও ক্ষণিকের। গল্প শুরু হয়, গল্প শেষ হয়। ফাঙ্গাসে আক্রান্ত চামড়া ও অন্ধের চশমা চোখে “ঘুরছে ফিরছে বহু আহত যৌবন” , যারা আগামীকাল নিয়ে ভাবা ত্যাগ করেছে। কি অসম্ভব কবজির তাগ’দে কবি ধরে ফেলেছেন- “এ জীবন পদ্মপত্রে জল” ! যারা এই কবিতাটি মন দিয়ে পড়বেন, তারা বুঝবেন এর মাহাত্ম্য।

পরবর্তী কবিতা - “গাছ বা বোবা মানুষ”, কবিতায় কবি একটি paradoxical axiomটেনেছেন। কবিতার মাঝখানে কবি বলছেন , “ বোবা মানুষেরা আসলে সবাই ভিতু” আর শেষে বলছেন “ভিতু মানুষ সচরাচর বোবা হয়”। কবি তার অভিজ্ঞতার পুঁজি থেকে গণিতের সারমর্ম বুঝেছেন। তাই, চোখ বন্ধ করেই তিনি দিক- নির্ণয় করতে পারেন। তিনি বুঝেছেন গাছেদের নির্বাক ভাষা এবং সেখান থেকেই তিনি টেনেছেন বোবা মানুষের মনস্তত্ব। তিনি শুনতে পান লকআউট কারখানার ভেতর ভৌতিক যান্ত্রিক ঘর্ষণ। অনেকটা সময় কোনও বস্তুর দিকে তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে তিনি তা ভেদ করে চলে যান অপর প্রান্তে। এবং পালিয়ে যান অন্য কোথাও – অন্য কোনও অধ্যায়ে। যেখানে তার জন্য অপেক্ষায় একজন বোবা মানুষ। তাহলে কি তিনিই প্রবেশ করেন কোনও গাছ বা বোবা মানুষের অভ্যন্তরে ও বোঝেন যে তিনি ভিতু হয়ে যাচ্ছেন? এই প্রশ্নটা, কবিতার অন্তিমে, “পাঠক-আমি” – কে ভাবিয়ে তুলল।

পরের কবিতা “পাঠকের প্রতি”-তে কবি ফিরে যেতে চান এক অসম্ভবকে সঙ্গে নিয়ে পাঠকের কাছে। যদিও তিনি নিশ্চিত নন সেটা বাস্তব ভিত্তিক কিনা! তিনি ভাবেন ঘাস জমির কথা, রাত্রির আকাশে প্যাঁচাদের কথা যেখানে তিনি দ্বিধান্বিত যে পাঠকেরও কিছু করতালি প্রাপ্য ছিল কিনা! ফিরে যাওয়ার পথে তিনি রেখে যেতে চান- “ শুকরের চর্বি আর মদের উল্লাস” । অর্থাৎ, দায়োনিসাসের প্রসাদ। ফেলে যেতে চান আরও আবর্জনার স্তূপ। পাঠকের জন্যই তিনি ছেড়ে যেতে চান এইসব প্রেত ও মমি। জমিনের অন্তরে, “সাড়ে তিন জন্মের বিরহে” , স্লোগানের সঙ্গে আজাদের ককটেলে, সুরার ব্যক্তিগত উৎসবে – সস্তা জনপ্রিয়তাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে , মহাকালের সমস্ত “বিষ দাঁত উপড়ে ফেলে”, কবি উড়ে যেতে চান তাঁর পাঠকের কাছে।

“দেবদারু”, কবিতাটি অত্যন্ত গভীর।পাঠকের মর্মস্থলে প্রবেশ করার মতো। কবি শীত ঋতুর গন্ধ পান দেবদারু পাতা দেখলে। পাখির আকাল – যেন পাতাগুলো বহু অপমান ধারণ করে রেখেছে। পাতারা বড় ধারালো। অথচ , কামহীন মানুষের প্রেমবিহীন জৈবনিক অস্তিত্ব হয়ে সজারুর মতো ওই পাতাগুলো মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছেও মানুষের মত ফিরে আসে। ছটা ঋতু তারা কাটায় একঘেয়ে এবং আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠে। মানুষের মৃত্যুমুখী অসুখ তারা ঈশ্বরের দিকে তারা তাক করে ছুঁড়ে মারে। যেন একাকীত্বের পৃথিবীতেই তাদের বাড়ি, আপন নারীর থেকে অনেক তফাতে – “পাখির শ্মশানে”। এই কবিতার আলঙ্কারিক ব্যবহার তারিফের হকদার। “দেবদারু” কবিতাটিও একটি মাস্টারপিস যা “পাঠক- আমার” মনন, হৃদয় জয় করল।

কবির মৃত্যু দর্শন বিন্দু থেকে ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে। অর্থাৎ, big bangবা chaos to cosmos। তার লেখার বিষয় না থাকলেও ক্ষুধা ও সন্তাপ কবিকে জাগিয়ে রাখে। মৃত্যুর পরের মুহূর্ত থেকে তার কবিতার শুরুয়াত। মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া সৎকার সমিতির গাড়ি থেকে তার কাব্যিক যাত্রার আরম্ভ। তিনি পৌঁছে যান “নক্ষত্র- শ্মশানে”। খাদ্য হিসেবে তাঁর মস্তিষ্ক দাবি করে ভার্মিলিয়ান সূর্য, পচে যাওয়া নিকস আঁধার। তিনি জাতিস্মরবাদে বিশ্বাসী। তিনি বিশ্বাস করেন নাভির যোগ বারংবার জোড়া লাগা ও ছিঁড়ে যাওয়ায়। কবি চান না কোনও দার্শনিকের ইশারা বা মতবাদ, কারণ তার নিজস্ব দৃষ্টি আছে। যেমন কোনও বৌদ্ধ মঠে পৌঁছনো যায়না , “ পা থেকে পা মেপে” , ঠিক তেমনই সুরার স্বাদ জিভে না নিয়ে পৌঁছনো যায় না “খালাসিটোলায় বা সোনাগাছিতে”। একইভাবে জলপথ ভ্রমণে কবির গা গুলিয়ে ওঠে, আত্মা ছেয়ে যায় তিক্ততায়- অন্ধকার দম্ভচক্রে। ঈশ্বরের এবং শয়তানের সহাবস্থান কবি দেখতে পান। দেখতে পান যে আসলে দুজনেই মৃত। যাদের অবয়ব বিশ্বাস করে না যে তারা হারিয়ে যাওয়ার জন্যে ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো থমকে যাবে – এমনকি তাদের মৃত্যুতেও না। কবি বেঁচে থাকেন “গ্লাসে ঢালা মদ আবার বোতলে ঢেলে”। সুতরাং, তিনি কালিমালিপ্ত হন প্রত্যহ মৃত্যু প্রসঙ্গে। কবি অচেতনে সন্ধান করেন “চরমের মধ্যে পড়ে থাকা নরমের” অথবা অর্থহীনতার। শেষ পংক্তিতে তিনি চিনিয়ে দেন সমকালীন বাংলা কবিতায় কোথায় তার স্থান – “ মৃত্যু যেন শুধু নির্মম আন্দাজ”। এ কবিকে বাঙালি পাঠক যদি চিনতে না পারেন তাহলে সেটা পাঠকের দুর্ভাগ্য। “মৃত্যু দর্শন” কবিতাটি পড়ে আমি বাকরুদ্ধ।

“ পরিত্যক্ত” কবিতাটি পড়ে আমার মনে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়। কবি কি নিজের মৃত্যুর কথা বলছেন!? কবিতাটি শুরু হচ্ছে, কবির প্রেমিকা বা স্ত্রীর উদ্দেশ্যে আত্মকথন দিয়ে। তাই, তাঁর নারী কিছুকাল কবির সন্ধান করেছিলেন ও আমিষ বর্জন করেছিলেন। তাঁর নারী মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। যদিও সে নারী মৃত্যু-প্রসঙ্গ উত্থিত হলে আনন্দিত হতেন; প্রিয়জনেরও। সিলিঙে ঝুলে থাকা পাখা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকত। তারপরেই, কবি বলছেন – “ শ্মশান বন্ধুর মতো চাঁদ সহবাসে ছুঁয়ে থাকত মেঘের শরীর”। অসামান্য একটি পংক্তি কত অনায়াসে লিখে ফেললেন তিনি। কবি তার নারীর শূন্যতা বোধ খুব সহজেই রূপকের মাধ্যমে ধরে ফেলেন কবিতার অন্তিমে। কিন্তু, শেষ পংক্তি প্রশ্ন রেখে যায় যে কবি কি ভিন্নলোক থেকে তার নারীকে দেখছেন!!

পরবর্তী কবিতা “ ইউনিটেক...বিকেল পাঁচটা চল্লিশ” নিয়ে আমার কিচ্ছু বলার নেই। কিচ্ছু না। পাঠক এই কবিতার জন্য, শুধুমাত্র এই কবিতাটির জন্যই এই গ্রন্থটি সংগ্রহ করুন। এইটুকু বলতে পারি কেন এই বইটির নাম “ক্লাউনের ডার্করুম” তার প্রিলিউড হিসেবে এই কবিতা আমার চোখ খুলে দিল। এর দৃশ্যকল্প, অলঙ্কার, রূপকের ব্যবহার পাঠক...! আপনি না পড়লে পস্তাবেন।

“আজ নিজেকে ঘৃণার দিন” কবিতায় কবি নৈরাজ্যের কথা বলছেন। কবি এখানে nihilist, বলছেন যা ইচ্ছে তাই করার কথা। যেমন তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য হল্লা করুক পাড়ার মস্তান ও তার সম্পাদক। আজ কবির “ আয়না ফাটবার আর কন্ডোম ফাটাবার দিন” হোক। এভাবেই কবি একটি তালিকা নির্মাণ করেছেন নিজেকে ঘৃণার দিনে। মুখে চুন কালি মাখা, বসন্ত কেবিনের সামনে পুরনো পত্রিকা বিক্রি করা, নাটকের অন্তিমে নিজেই নিজের ছায়াচিত্রকে হত্যা করা, গর্ধবের কণ্ঠে নিজের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকা নিজের নামধরে… এগুলো কবির অন্তরের anarchist চরিত্র, তা না থাকলে কোনও শিল্পীই শিল্পী হয়ে উঠতে পারেননা। তা সে কবিতাই হোক বা চলচিত্র এই anarchy- ই ছিল Allen Ginsbergবা ঋত্বিক কুমার ঘটকের মধ্যে। কবির পুতুল তছনছ করেছে যারা, যারা সময়ের মাটি খুঁড়ে কুকুরের মতো খুঁজেছিল পুঁতিগন্ধময় দলিল – দস্তাবেজ, কবির রক্তে কলম ডুবিয়ে যারা লিখে গেছে নিজস্ব সংকলন, অথচ, স্বমেহনে আত্মহারা হয়ে চিনতে পারেনি এই শহর, তারা কী কবি?? এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন ঔরশীষ। তিনি জানতে চান- “কে কার ধর্ষক এবং ধর্ষিতা কে কে?” এবার তিনি metaphysical বাস্তবে দণ্ডায়মান। গতকালের কথা গতকাল শেষ হয়ে গেছে- “আজকের আপডেটে তুমি অন্য কেউ”। কবির প্রেমিকার মুক্তি নেই। কারণ মৃত অজগরের মতো শায়িত নির্মাণের পথ, তার প্রেমিকা স্পর্শ করে আছেন নিজেরই কফিন।

“প্রেম নয় প্রেমিকসুলভ” কবিতাটির সম্বন্ধে আমি লিখতে নারাজ। কারণ একেকজন পাঠকের কাছে একেকরকম তাৎপর্য নিয়ে পঠিত হবে এই কবিতা। তবে বলতে পারি, এটি একটি সেরেব্রাল-কাব্য, যার বিভিন্ন অর্থ ভবিষ্যৎ পাঠক্রমে করা হবে। যেহেতু আমি কোনও প্রাবন্ধিক নই, তাই আমার পক্ষে নীরবে এর রস সেবন করাই সমীচীন হবে।

পরবর্তী কবিতা “হ্যামলিনের শহর” ঈষৎ abstract। এর আবেদন মননের কাছে। তিন ভাগে বিভক্ত এই কবিতাটি বেশ ধোঁয়াটে। প্রথম পংক্তিতেই পাঠক ধাক্কা খেতে পারেন। কবি বলছেন চোখের নীচে বালুচরের অবস্থিতি কিন্তু গহীনে সন্ত্রাস। প্রশ্ন থেকে যায়। পরের পংক্তিতে অনেকটা স্পষ্ট হচ্ছে কবির ইশারা। অশ্বের ঝাঁক দৌড় লাগায় নীল চাবুকের ঘায়ে। অর্থাৎ, দৃশ্য ঘটছে বালুচরে আর দ্রষ্টা কবি দেখছেন সন্ত্রাসের বেলাভূমি। তৃতীয় পংক্তিতে যদিও “হৃদয়” আছে কিন্তু তার উপস্থিতি নেই। চাঁদ এখানে রোম্যান্টিক অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। চাঁদকে কবি সেঁকে নিচ্ছেন গোধূলির ছাইচাপা ধুনুচি হৃদয় দিয়ে। চুরমার হয়ে যাচ্ছে কুয়াশার পরিচ্ছদ। মানুষের ভোরের স্বপ্ন খান খান হয়ে যাচ্ছে “ শিশুর কান্নার মতো নিরপেক্ষ শোক”-এ। হ্যামলিনের শহর জনহীন হয়ে যায় বেহালাবাদকের পথ পরিভ্রমণে। দ্বিতীয় ভাগে – কবি সংগ্রহ করেছেন অনেক কিছু- “ শরীরের মোম”, “স্ফটিক বিষ্ময়”, “পোড়া গন্ধকের ঘ্রাণ”, “আর্তিবাশিৎকার”… “চাঁদ” এখানে মাদক যা কবি মিশিয়ে দিচ্ছেন হ্যামলিনের অন্তিম পেগে। তৃতীয় ভাগে- কবি কিছু রাখছেন কিছু ধ্বংস করছেন। যেমন রাখছেন, “ আলো”, “ আইভরি বাক্সে রাখা ময়ূর পেখম”, “বিষ”, আর ধ্বংস করছেন “বাড়ি” যা থেকে জন্ম নিচ্ছে ঘর। তিনি আদতে বোহেমিয়ান। হ্যামলিন তাকে হাতছানি দিচ্ছে, যেখানে তার জন্য অপেক্ষমাণ অতল খাদ।

পরবর্তী কবিতা “ক্লাউনের ডার্করুম” একটি দীর্ঘ কবিতা যার মধ্যে ধরা পড়েছে শঙ্করাচার্যের “মায়াই সত্য জগত মিথ্যা” এটি এমন একটি কম্পোজিশন যা থেকে একটি গোটা গ্রন্থ রচিত হতে পারে। আমার অনুমান ভবিষ্যতে সেটাই হবে। Libido ও mortido-র অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটেছে এখানে ; বিষাদ ও উল্লাসেরও। এক ক্লাউনের চোখ দুটোকে কেন্দ্র করে এই কবিতার দর্শন নির্মিত হয়েছে। নির্মিত হয়েছে তার আলো ও অন্ধকার অর্থাৎ তার “ডার্করুম”। এই কবিতাটি ব্রহ্ম নামক সার্কাসকে ঘিরে লেখা। পাঠকেরও দীক্ষার প্রয়োজন আছে এটির রস আহরণ করতে গেলে। তাঁকেও ক্লাউনের মনস্তত্ব পাঠ করতে হবে। পাঠক ! আপনি এই কবিতাটি পড়ুন এবং সঠিক মার্গে থাকা কবিতার ভক্তদের পড়ান।

গ্রন্থের শেষ কবিতা “অবশিষ্ট” একটি এপিটাফের মতো। ছটি ভাগে বিভক্ত এই কবিতাটি। প্রথম ভাগে কবি বলছেন কোথায় কোথায় কবি রয়ে যাবেন। আলোচনার সভার সাগরে, মঞ্চের আলো আঁধারিতে, ইচ্ছে ও স্বাদহীন খাদ্যের অনিচ্ছেয় ; যখন তিনি বুঝবেন না , “ জীবিতে বা জ্বরে” – প্রতিমুহূর্তে তিনি কোথায় বাস করছেন। তিনি ঘুমিয়ে পরতে চান, মিশে যেতে চান, চুপি চুপি “ যেসব কবরে মৃত কবিরাও কাঁদে”

দ্বিতীয় ভাগে তিনি কত অনায়াসে বলছেন, “ চোখের কার্নিশে” দাঁড়িয়ে থাকাকালীন তাকে জাপটে ধরা “গল্পঘুড়ি”-র কথা। গল্প কোন পথে যায় তার তালিকা দিচ্ছেন কবি। যার মধ্যে তিনি লিখছেন – “ট্রামলাইন তোমার ধানসিঁড়ি হয়ে ডানা ভাঙা চিঠির হলুদ মাখে”। কাবিলে তারিফ একটি পংক্তি। জন্মবার্ষিকী অর্থহীন হয়ে যায় আর চিৎকার শুধু ঘোরে ফেরে “তামসিক শিস”-এ এবং সোহাগের স্মৃতি হয়ে ওঠে ফানুসের মতো উড়ন্ত কিছু উৎসবের হস্তাক্ষর।

তৃতীয় ভাগে কবি অত্যন্ত সহজ কথায় গভীর কথা বলে দিয়েছেন। তিনি তার প্রেমিকার চোখে চোখ রাখেন দুবার। একবার বিবাহে আর একবার মর্গে। বাকিটা অভিনয় যার জন্য প্রাপ্যজীবন নামক এই T-20-র হাততালি। এই ভাগের শেষ দুপংক্তি লিখতে গেলে একজন কবির করতালি নয় জাত লাগে। “ জন্মের ভাউচারে বা মৃত্যুর চালানে / জেব্রা-রঙ্গা মিথ্যে মিথ”।

চতুর্থ ভাগে কয়েকটি দৃশ্য নির্মাণ করেছেন কবি, যার রস পাঠক এটি পড়লেই আস্বাদন করতে পারবেন।

পঞ্চম ভাগ পড়বার পর “ওয়াহ!” বলা ছাড়া গত্যন্তর থাকেনা। পড়ুন। তারপর আপনিও আমার সাথে সহমত হবেন।

ষষ্ঠ ও অন্তিম ভাগে কবি প্রশ্ন রাখছেন তাঁর প্রেমিকার কাছে যে তার কবিতার কাছে প্রত্যাবর্তন কবে হবে! যবে তাঁর জীবন নিষ্কাম হয়ে যাবে, তবে ? যবে তিনি সহমরণে যাবেন কিংবা দেহপসারিনী হয়ে যাবেন! Dramatic monologue-এর মতোই এই প্রশ্ন তার মননকে গ্রাস করেছে বলেই তিনি তা রাখছেন নিজের কাছে। স্রোতা তার নারী। Robert Browningতার কবিতায় যেমন লিখে গেছেন অনেকটা তেমন। সৌরলোকের অগ্নিপিণ্ডে ভস্ম হবেন কবে, এই প্রশ্ন কবি রাখছেন তাঁর মাশুকার উপস্থিতিতে। কবে তিনি ভাসাবেন মজে যাওয়া পুকুরে “পদ্মের বীজ”? তিনি ঘৃণ্য হতে চান, বিতর্কিত হতে চান, যাতে ছুঁতে পারেন তার কাব্য প্রতিমার শরীর। তার উদ্দেশ্য- নিজের শিকড়ের কাছে পৌঁছে তার মাটি আঁকড়ে ছেলেবেলার বিকৃত কংকালটাকে ভেঙ্গে চৌচির করা। কবি তার প্রেমিকার কাছে প্রেরণা চান না। চান তাঁর প্রেম হয়ে উঠুক “প্রোথিত অসুখ”। ছায়াপথ যেন তাকে নিয়ে যায় আখরের সমাধিতে, যেখানে আরোগ্য হিসেবে রাখা আছে তার অলিখিত নির্বাণ।

এখানেই শেষ হচ্ছে একটি অমোঘ পাঠ্য “ক্লাউনের ডার্করুম”, যা আমার মতো পাঠককে , নাড়িয়ে দিয়েছে , নড়িয়ে দিয়েছে। ঔরশীষ ঘোষ এমন একজন কবি যাকে এড়িয়ে যাওয়া সহজ পেরিয়ে যাওয়া কঠিন। এটি তাঁর প্রথম গ্রন্থ। আমি চাই – তিনি যে শব্দ দিয়ে জাদু বিস্তার করেছেন, তা আরও বিশুদ্ধ হতে থাকুক। আমি চেয়ে রইলাম তাঁর ভবিষ্যৎ স্বপ্নলোকে। Bravo !