গল্প : বৈদূর্য্য সরকার

চরিত্র

স্লিপারে ট্রাভেল করার সবথেকে বড় সমস্যা হল, কামরার প্রচুর লোকের সাথে যেতে হয় । তার মধ্যে অধিকাংশেরই রিজার্ভেশন নেই । টিটিকে টাকা দিয়ে তারা ওঠে । তারপর ‘একটু চেপে বসুন’ কিংবা পায়ের কাছে বা শুয়ে পরার পর নিচের জায়গায় কোনোক্রমে শুয়ে বসে অথবা বাথরুমের সামনে কিংবা চলন পথে যত্রতত্র ।

বিরক্ত হওয়া, ঝগড়া করা কিংবা ওজর আপত্তি কতক্ষণই বা করা যায় ! শেষ উপায় টিটিকে নালিশ করা । আমাদের সে যাত্রার টিটি বেশ ঘোড়েল । আমি যখন বললাম, আপ টিকিট চেক করেগা ? শুনে সে অবাক হয়ে বলেছিল, কিউ নেহি ! আমি উত্তর আগে থেকেই রেডি করে রেখেছিলাম, বললাম – মুঝে তো ইয়ে কামরা জেনারেল লাগ রাহে হ্যায় । আমার হিন্দির বহরে কিংবা দার্শনিক সুলভ ভঙ্গিতে অদ্ভুত হেসে সে বলল, হররোজ তো তেওহার নেই আতা হ্যায় বাবু ... সুতরাং তার কিছু করার নেই । উৎসব বলে কথা !

যতই টাকা খেয়ে এসব বলছে বলি না কেন, আসলে সত্যিই কারুর কিছু করার নেই । সবথেকে বিরক্তির যেটা, বউ বাচ্চা নিয়ে উঠে বসা লোকজনদের সাথে কতক্ষণই বা দুর্ব্যবহার করা যায় ! আমার ডান পাশে একটা রীতিমতো সুন্দরী মেয়ে আসানসোলে নামবে বলে যেন আমাদেরই ভরসায় ট্রেনে অনেকক্ষণ উঠে বসে আছে । তাতে চোটপাটের উত্তরে সে বলল, তাহলে আমি কোথায় বসব ! শুনে আমাদের পাষাণ হৃদয়ের গলতে আর দ্বিধা কিসের ! আরেকপাশে আরেকটি মেয়ে । সে খানিকটা দেহাতি । তার সঙ্গে দুজন ছেলে । একজন বর হলে অন্যজন কে ? সেই ছেলেটা কি একটা বলতে এলে তাকে আমি যাতা বলতে শুরু করলাম । এরা এভাবেই পঁচিশ ঘণ্টার জার্নি করতে চাইছে । সামনে যেকোনো সম্পর্কের মেয়ের সামনে মাথা নত করা বেশী লজ্জার বলেই হয়ত সে কিছুক্ষণ লড়ল টিটিকে টাকা দিয়ে পাওয়া স্লিপের অজুহাতে । তারপর অন্য ছেলেটা করুণ ভঙ্গিতে আমাকে খানিকটা শান্ত করে ওকে কয়েকবার – ‘শঙ্কর আব চুপ হো যা’ ... বলাতে পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হল ।

বেশ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল সাইড লোয়ারের সিটে আমার পাশেই সেই শঙ্কর বসে আছে নিশ্চিন্তে । আমিও নিশ্চেষ্ট হয়ে তাদের সঙ্গিনীর সাথে বাকী দু’জনের সম্পর্ক আঁচ করে সময় কাটাতে লাগলাম ।

পুরনো দিল্লীর ঘিঞ্জি গলি থেকে কাবাব কিনে ফেরার সময় হঠাৎ দেখা হয়ে গেল তার সাথে । অন্য কিছু না পেয়ে তার সাথে এক টোটোতে উঠেছিলাম । তার গায়ে কালো রঙের হিজাবের ব্যাকগ্রাউন্ডে ফুটে থাকা উজ্জ্বলতা । বেশ মোহময় আতরের গন্ধ । লক্ষণীয় ছিল যেটা, তার উদ্ধত ভঙ্গিতে একটা পা উল্টোদিকের সিটে রেখে ব্যালান্স করা ভঙ্গিমা । তখনই লক্ষ্য করেছিলাম তার হাত পায়ের মেহেন্দি । বলেছিলাম, এর’ম কমপ্লেকশানেই এসব মানায় ।

সাথের বন্ধুর সাথে বেশ খানিকটা বাংলা বিশ্রম্ভালাপে বারবার উঠে আসছিল সৌন্দর্যের কথা, আভিজাত্যের কথা, আরও নানা বেসামাল ইঙ্গিত । কথায় কথায় বলে ফেললাম, একেই বলে ডাঁহাবাজ । ও আমাকে সতর্ক করার জন্য বলল, ঐ শব্দটার মানে কিন্তু এখানে সবাই বুঝে যেতে পারে ! অবশ্য এত ভাবনা মাথায় থাকছিল না । ভাবছিলাম নামবো চাউরি বাজারে । যেখানে মির্জা গালিবের বাড়ি ছিল ।

একটু পরে চতুর্থ সিটটাতে আমাদের সঙ্গী হল ভাঙাচোরা চেহারার একটা লোক । সে ঐ মহিলার সাথে টুকটাক কথা বলতে চাইলেও উনি ততটুকু উত্তরই দিচ্ছিলেন যতটা ওনাকে মানায় । আমাদের টুকটাক কথায় লোকটা উৎসাহিত হয়ে এরপর জিজ্ঞেস করল, আপলোগ কেয়া কলকাতা সে আয়ে হো ? আমাদের কিছু বলার আগেই সুগন্ধের অধিকারিণী মহিলার কথা শুরু হল ... ইতনা মিঠি বাত শুননেই তো পাতা চলা জাতা হ্যায় ।

আমাদের অবাক করে উনি বললেন, আমি একটু একটু বাংলা ভি জানি... বহুত সাল পেহেলে একবার কলকাতা গিয়া থা ... ও যাঁহা হাওড়া ব্রিজ... ।

এতটা শুনে আমারা প্রমাদ গোনা যে কি জিনিশ বুঝতে শুরু করেছি । অর্থাৎ আমাদের ওইসব অনৈতিক স্তুতি শুনেছেন এবং বুঝেওছেন উনি । যদিও তাতে যে কোনও আপত্তি নেই তা বুঝে আমরাও প্রগলভ হলাম বেশ ।

উনি বলছেন, বাঙ্গালিলোগ মুঝে বহুৎ মহাব্বত দিয়া উস সময় ... আমাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, তখন স্লিম ভি ছিলাম ... শোনা ইস্তক আমরা ঘাবড়ে গেছি । সুগন্ধা নামটাতেই ওনাকে মানায় বুঝতে পেরেছি । সাথের ভাঙাচোরা লোকটার নাম শুনলাম- শাহজাহান । নামার সময় ‘আল্লা হাফেজ’ বলে ক্ষ্যাপার মতো হাঁটতে লাগলাম । চাউরি বাজার মীর্জার বাড়ি সব গুলিয়ে অলি গলির ভেতর যে কোথায় যেতে চেয়েছিলাম !

শাহজাহানের সাথে শঙ্করের যোগাযোগ হয়েছিল সুগন্ধার সুত্রে । ভারী অদ্ভুত ছিল সুগন্ধার ভাবভঙ্গি। ও কি বেশী সরল ছিল বয়সের তুলনায় ? মনে হত - সুগন্ধা সোজা কথায় গরীবের মেয়ে নানারকম জৌলুশ দেখে হারিয়ে গেছিল । আমরা সুগন্ধাকে দেখেছিলাম শঙ্করেরর বান্ধবী হিসেবে । শুনেছিলাম ওর বাপ কি কারণে যেন কিছুদিন জেলে আছে, ওর মায়ের সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর থেকে । সদ্য যুবতী সুগন্ধার পোড়োবাড়িতে আধপাগল ঠাকুমা ছিল শুধু । অবাক হয়ে দেখেছিলাম বেশ ক’মাস ওদের বাড়িতে ইলেকট্রিকের লাইন কাটা । শঙ্করের সেসময় কিই বা করার ছিল, সবে ব্যবসা শুরু করেছে ও । অবস্থাও বিশেষ ভালো ছিল না, সাপ্লাইয়ের ব্যবসায় সুবিধা করতে পারছিল না, সর্বত্র ধারদেনা । তবে শাহজাহান ওদের দুজনকেই প্রচুর টাকা ধার দিত । এটা জেনেই দিত – যে ও আর শোধ হবে না ।

শাহজাহানের মনে হত প্রেমচন্দের ‘সওয়া সের গম’-র শঙ্করের মতোই অবস্থা হয়েছে ওর, সারাজীবনেও গোলামি ঘুচবে না । যদিও শঙ্কর মনের মধ্যে নিষ্ফল আক্রোশ নিয়েও কিছু করতে পারতো না শাহজাহানের । যদিও বুঝতে পারতো সে আসলে সুগন্ধাকে লোভ দেখাচ্ছে ।

শাহজাহান গোছানো পারিবারিক ব্যবসা হাতে পেয়েছে, জীবনটাকে কাব্যিক মনে হলে ফল যা হয়... শেক্সপিয়ারের আডপ্টেশানে কেন বিশাল ভরদ্বাজ সেরা সে’সবের সমজদার । তবু এদিক দিয়ে গেলে শাহজাহান দু’পাত্র খেয়ে যেত। বন্ধুত্ব না হলেও, একসঙ্গে বেড়ানো আড্ডা খাওয়াদাওয়া ।

তা সত্ত্বেও সুগন্ধা কেন যে শঙ্করের দিকেই বেশী ঝুঁকছিল বুঝতে পারেনি কেউই। সুগন্ধা যে কোন আক্কেলে শাহজাহানকে এড়িয়ে আলাদা থাকতে চাইছিল, সেটাও কেউ ধরতে পারছিল না । সেদিন সরাসরি শঙ্করকে চেপে ধরে শাহজাহান এখানে এসেই। সাথে দু’চারজন ছিল। শঙ্করের এটা নিজের এলাকা, সেও এত সহজে ছেড়ে দেবে না । সেই শনিবার বেশী নেশার ঝোঁকেই হয়ত, শঙ্কর ওকে বলেছিল- ‘ফয়সালা শনিবারে’ ...

শাহজাহান লক্ষ্য করে দেখছে টাওয়ার বারটা আগের মতোই রয়ে গেছে। শিয়ালদার এই জায়গাটাও। ফ্লাইওভার হওয়াতে পুরনো লোকেদের চিনতে অবশ্য একটু অসুবিধা হয় । আজকের এই সন্ধেটাতে সবকিছুই যেন বড় বেশী অবাক করা । কেনই বা মনে পড়বে এত বছর আগের এক বর্ষার বিকেলের কথা, ছেলেমানুষি সেই বাজীর শর্ত । কেন শাহজাহান সেসব মনে রেখে অপেক্ষা করছে ! তখন জীবন কিছু অন্যরকম ছিল, শহর অন্যরকম ছিল, বয়সও কম ছিল। এত বছর কেটে আজ আবার একটা শনিবার । এখন শাহজাহানের এখানে আসার কথা নয় । তার বেঁচে থাকার লেয়ারটা পাল্টে গেছে। তবু এককোণে বসে, দু’পেগ নিয়ে জরিপ করে যাচ্ছে সবাইকে । কাউকেই ঠিকমতো মনে হচ্ছেনা। শঙ্করের মুখ কি ভাল মনে আছে? এত বছরে পাল্টে যাওয়া চেহারা কি সত্যিই চেনা যায় ? ও কি বদলায়নি, যে শাহজাহানকে খুঁজে পেয়েছিলাম ‘পূর্ব পশ্চিমে’ । প্রেমের কারণে খুন পর্যন্ত করেছিল যার বন্ধু !

*

দু’জনে একটা মেয়েকে চেয়ে একজনই তাকে বিয়ে করতে পারে, এটাই চালু নিয়ম...শাহজাহান কি আজ সেটাই দেখতে এসেছিল শঙ্কর কেমন আছে ওই দাঁওটা মেরে ? যদিও আসলে সামাজিকভাবে হেরে যাওয়া শঙ্করদের যেখানে সেখানে দেখতে পেয়েছিলাম আমরা । শাহজাহান যে সব ব্যাপারে এগিয়ে গেছে সেটা দেখাতে ফিরে আসতো, নাকি আসলে গল্পের শেষে হেরে গেছিল বলেই ! যৌনতায় বাধ্য করা সুগন্ধার সন্তানের খবর নিতে শাহজাহানদের ফিরে আসা লক্ষ্য করছিলাম আমরা । সুগন্ধাকে পড়েছিলাম মান্টোর গল্পে ।