গল্প : অনির্বাণ ভট্টাচার্য

অমৃতস্য পুত্র

অমৃত কহিল – ‘আয়’। মাইলফলক উঠিয়া যাওয়ার পর আর যেমন ঈশ্বরচন্দ্রকে খুঁজিয়া পাওয়া যায়নি তেমনি কড়িকাঠের মোনোটোনিতে বিরক্ত হইতে হইতে একটা সময় মানুষ গুনিতে ভুলিয়া গিয়াছিল। এহেন বিস্মৃতি গণিতের পক্ষে বাঞ্ছনীয় নহে বলিয়াই অমৃত একমাত্র পুত্রকে বিজ্ঞান বিভাগে আসিতে নিষেধ করিয়াছিল। সে শোনে নাই। এমনকি মঞ্জুর নিকট ইহাও সংবাদ পাওয়া যাইতেছে যে মল্লার ক্লাস পরীক্ষায় শীর্ষে রহিয়াছে বেশ কয়েক দিন ধরিয়া। সেই মল্লার, যে এখনো মায়ের সহিত অধিক সময় কাটাইয়াও পিতাকেই ভরসা করিবার মাধ্যম হিসাবে গণ্য করে, এবং পাখার ব্লেড গুণিতে পারার সফল আক্রোশে সে এক ভাঙ্গাচোরা সোফায় অর্ধশায়িত হইয়া অসফল ঘর্ম নিঃসরণকেই ভাগ্য জানিয়াও সেই পিতার দিকেই তাকিয়া থাকে। অমৃত কহিল ‘আয়’। গলা খাঁকারির ন্যায় শোনা যাইল। মঞ্জু এঘরে থাকিলে এতক্ষণে নিশ্চয় দুবার ভ্রূ কুঁচকাইয়া সন্মুখে ঈষদুষ্ণ জলের পেয়ালা হাজির করিত। অমৃত তবু আরেকবার কহিতে চেষ্টা করিল – ‘আয়’। কোনও শব্দই নির্গত হইল না।

শব্দ নিয়ে খেলা খেলিত অমৃত। পিতার সহিত। বর্তমানে কহিত শব্দতরঙ্গ। আনন্দবাজার শব্দছক। পিতা একটি মূর্তিমান অভিধান। অমৃত কলম-চেবন কারী অজিত-তপেশ গোত্রের কেহ একটি। তবু, মনেপ্রাণে শব্দ ভালোবাসিত অমৃত। মল্লার-ও। সেদিন যেমন। ১২-র পাশাপাশি। সঙ্গমের সময় নির্গত মুখনিঃসৃত স্বর। মল্লারের সহিত দৃষ্টিবিনিময় হওয়া মুশকিল। কোন হারামজাদা যে এহেন ট্র্যাশ উপস্থিত করে। মরালিটি বলিয়া কিছু নাই। মঞ্জু আসিয়া একবার ডাকিয়া লহিয়া যাইতে পারে তো পুত্রকে... ইহারা কেহই কোনও কম্মের নহে। কাঁপা কাঁপা হস্তে অমৃত লিখিয়া যাইল কাঙ্খিত উত্তরটি। মল্লার কিছু বলে নাই। কেবল মুখ বাড়াইয়া পড়িয়া লহিয়াছিল শব্দটি। ইহা পর্যন্ত-ও ঠিক ছিল। সমস্যাটা আসিল ঠিক পরেই। ১২-র ওপর নীচ। মেনুকার্ডে ভেজ পাইয়া সপাটে ওভার বাউন্ডারি মারিতে উদ্যত হইল বছর চল্লিশের অমৃত মুখোপাধ্যায়। পিতৃদত্ত ভিটে বড়নীলপুর। মাতুলের সহিত শেষ বার ফিরিয়া আসার কথা মনে পড়িয়া যায় অমৃতর। মিহিদানার টাকা চাহিয়া অপমান করিবার সাহস পিতার পরিবারের কারোর ছিল না। মাতুল সেই পথ দিয়া যায়নি। তবে অমৃত গেছিল। সে পথ দিয়ে। অফিসের একটি ছেলের বিবাহের সূত্রে। যদিও, ও বাড়ি মাড়ায়নি। এখন ঘর ভাড়া। অধুনা সুকিয়া স্ট্রীট। রাজা রামমোহন রায় সরণী। সে কি ব্যক্তিত্ব। কি রূপ। অমৃত পড়িয়াছে। ছোটবেলায় পিতাকে বলিত, দেখা করিবার ইচ্ছা। পিতা বলিত, ব্রিস্টলে যা। ওনার মূর্তি আছে। ১২-র ওপর নীচ। ‘-‘ নিয়ন্ত্রিত। ঠাণ্ডাগরম সংক্রান্ত। অমৃত অর্ধেকটা লিখিয়াই বুঝিল গণ্ডগোল, বিস্তর গণ্ডগোল। মল্লারের মুখ দেখিল। শুধরিয়া নিল। শীততাপ নহে, শীতাতপ। একটা পরিতৃপ্তির হাসি হাসিবে, আচমকাই চক্ষুর পরিধি বরাবর হাঁটিয়া পুত্রের সহিত দৃষ্টি বিনিময় হইল। বালক কড়িকাঠের দিকে তাকাইয়া আছে। কোমল চিবুকে ঘর্ম নিঃসরণ। শব্দছক এখনো ঢের দেরি। অমৃতর মনে হইল তলপেট ব্যথা করিতেছে। সে উঠিয়া গেছিল।

তলপেটের দোষ নহে। অমৃত-র মনে পড়িয়া গেল জাগরণীর পরেশলালের মুখ। শিল্ডের ফাইনাল ম্যাচ। প্রথমার্ধে মারিয়া খেলিতেছিল জাগরণী। অগ্রণীর প্রতিরোধ বলিতে কিছু ছিল না। অমৃত ঠিক করিল ইহাই সুযোগ। গোড়ালি আলগা বলিয়া গ্রীক অ্যাচিলেসের বদনাম রহিয়াছে। পরেশের তলপেট এখন সেই বদনাম কুড়োবে। গ্লুকন-ডি-র বোতল প্রত্যেকের আলাদা আলাদা ছিল। পাড়ার নকুড়কে ফিট করিয়া রাখিয়া ছিল। এমনিতেই নারীদের প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত টিটকারি-র জন্য নকুরের খ্যাতি ছিলই। শুধুমাত্র গণিতের মাথাটি অবিশ্বাস্য ভালো বলিয়া পাড়ার দাদা অমৃত আগলিয়া রাখিয়াছিল। তাই, সেহেন অমৃত-র মুখেই এই প্রস্তাব শুনিয়া সামান্য আশ্চর্য হইয়াও পরক্ষণে চোখ টিপিয়া নিজেকে শুধরিয়া নিয়াছিল নকুর। কি মিশিয়াছিল তাহা অমৃত-র জানা নাই। তবে, দ্বিতীয়ার্ধের মিনিট চারেকের মধ্যেই যখন তলপেট চাপিয়া মাঠ ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছিল পরেশ, নকুরের মুচকি হাসির মাঝেও অমৃত বিস্মৃত হইয়াছিল অনেক কিছুই। তাহার মধ্যে পড়ে ...থাক। খেলাটা বড় অবধি চালাতে পারে নাই অমৃত। পরেশ কিছু দূর গিয়াছিল। কলিকাতা প্রথম ডিভিশনের কোনও এক দলের সহিত ম্যাচের মাঝেই আবারো মাঠের মধ্যেই পড়িয়া গিয়াছিল পরেশ। তবে, তলপেট চাপিয়া নহে। গোলরক্ষকের সহিত সংঘর্ষ, তদুপরি অত্যধিক গরম, আদরের দুলাল পরেশ এসব নিতে পারে নাই। কাগজের লোক পরেশের বাড়ি থেকে পুরনো পাসপোর্ট আকারের ছবি চাহিয়াছিল। পরেশের তুলা-পরিবৃত নাসিকা গহ্বরের চার ইঞ্চি দূরে মাঝেই মাঝেই ফিট হইয়া যাচ্ছিলেন নিরুপমা-দেবী। পরে, অমৃত অনেকবার নিরু বলিয়া ডাকিবার চেষ্টা করিয়াছিল। পারে নাই। তবে কাল বিকালেও যেমন পুত্রকে লইয়া ইস্কুল-ফেরত বয়েসী নিরুপমা অমৃত-র দিকে স্মিত ‘ভালো আছেন’ বলিয়া চলিয়া গেছিল। আর অমৃত লোডশেডিং-এর বারান্দায় আরও বেশী অন্ধকার হইয়াছে দেখিয়া ঘরে চলিয়া গেছিল, মোমবাতি এবং দেশলাই-এর সন্ধানে। বলা বাহুল্য, অমৃত-র আলো জ্বলে নাই।

মানিকতলা মোড়ে রজতাভ-র সহিত দেখা। এমনিতেই পথিমধ্যে পিতার বন্ধুস্থানীয় কারোর সহিত দেখা হইলে বিরক্ত হয় মল্লার। এবারো হইয়াছিল। ডেলিভারির লোক নিয়াই ঘরে ফিরিতেছিল রজত। ‘ভালো ব্র্যান্ডটাই নিলাম বুঝলি। খরচ বেশী। তবু, মাল সলিড। তাছাড়া বাচ্চাটার গরমের ধাত। বউটারও খানিকটা। আর মিথ্যে বলব না, আমারও খারাপ লাগে না। তবে, তুই পারলে ... নিতে পারিস। ২৫ এর মধ্যে। অ্যাফর্ড করতে পারবি’। খোঁচাটা গায়ে মাখে নাই অমৃত। তবে পুত্রের মুখের দিকে তাকাইয়া তাহার প্রথমবার হিট স্ট্রোক হইবার উপক্রম হইয়াছিল। আঙুল খিমচিয়া ধরিয়াছিল মল্লার। অনেক গলদঘর্ম করিয়া পিতা হইয়াছিল রজত। নার্সিংহোম ফেরত বলিয়াছিল ‘ভোজ দেব, মহা ভোজ’। এক কানাকড়িও খাওয়ায়নি। এখন ব্র্যান্ড মাড়াইতেছে। শুনিয়াছিল সমস্যাটা রজতেরই। ফারটিলিটি ক্লিনিক-ও কথা দিতে পারে নাই। তবু, কোথা হইতে কী হইয়া গেল ...। সাইকেলে পা ফেলিয়া পুত্রের কর্ণের অদূরেই ফিসফাস করিয়া ‘সালা ধজো’ বলিয়াই সামলিয়া নিয়াছিল অমৃত।

কেষ্ট সামলাতে পারে নাই। কৃষ্ণকালী দাস। না, বিহারী নহে। পাঁচনদী-র রাজ্য ফেরতও নহে। হয়ত তাই অবাঙ্গালী ট্যাক্সি ইউনিয়নে উহাকে কেহই পাত্তা দিত না। অমৃত মাসের মাহিনা পাওয়ার দিন কেষ্টকে বলিয়া রাখিত। যাইত, আসিত। মঞ্জুদের না বলিয়াই। সাধারণত রিফিউস করিবার মজাটি যাত্রীদের সহিত কেষ্ট খুব একটা করিত না। বোম্বাই থেকে কলিকাতা দেখিতে আসিয়াছিল রাজবাড়ির কিছু কুটুম। বলা হইয়াছিল ঘণ্টা তিনেক। ন্যাশনাল মিউজিয়াম অর্ধেক দেখিতে দেখিতে বাচ্চাদের কেহ গোঁ ধরিল চিড়িয়াখানা, গাড়ি ঘোরাতে না ঘোরাতে ‘এই গরমে চিড়িয়াখানা’ প্রস্তাব বাতিল হইয়া মাদার হোম, সেখানে সমাজ দর্শন করিবার পর ‘হ্যাঁ গো এদ্দুর এসছি, একবার’ ...কত্তারও ইচ্ছে ছিল নিশ্চয়। হিঙ্গের কচুরী নিয়া পাক্কা দুই-দুই ঘণ্টা পর যখন ললাটে তিলক লইয়া কেষ্টকে জাগাইতে এলো ওরা, বুঝিল না কী এমন হইল যাহাতে ট্র্যাফিক পুলিশকে ড্রাইভারের ওষ্ঠাধর কিঞ্চিত গ্যাঁজলা পরিবেশিত হইয়া বাঁদিক হেলিয়া আছে কেন দেখিতে লোক জমা করিতে হইয়াছিল। অমৃতর ইহার পর থেকে মাসের দিনক্ষণ ২ তারিখ হইতে গণনা শুরু করিত। বিশে পাগলাকে রাস্তায় পড়িয়া থাকিতে দেখা গিয়াছিল এরকমই এক সংকটজনক গ্রীষ্মে। পাগল। চালচুলা নাই। মরিবে যত্রতত্র, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু অস্বাভাবিক ছিল, কারণ বিশের সারা বছর শীত করিত। মোটা চাদর মুড়িয়া রাখিত গাত্রে। ‘খেয়েছিস আজ?’ কেহ শুধাইলে সে কহিত ‘গুলাগে রাখিয়া আসিয়াছি। ওরা খাবে’। কোথায় গুলাগ, কেই বা ওরা, কৌতূহলের সাহস জোগায়নি কাহারো। এমনকি লাশের শরীরেও নাকি চাদর আঁকড়ে ধরিয়া থাকা মুষ্টিবদ্ধ হাতটি গোটা পাড়াকে পরবর্তী কয়েকদিন সেন্স অব হিউমারের খোরাক জুগাইয়া চলিত। অমৃতর মাতার কথা মনে পড়ে। গৃহে অতিথি আগমন অশুভ হিসেবে গণ্য করিতেন। পিতাকে আজই অন্যত্র চলিয়া যাইবে বলিয়া শাসাইতেন। টুক ক’রিয়া একদিন ফুল আনিতে গিয়ে ফিরিতে দেরী করিয়া ফেলিয়াছিলেন আশালতা। অমৃত ভাবে, ওপারে এখন পরপর অতিথি, খাইতে বসার আগে এক এক ক’রিয়া কেষ্ট, বিশে, পরেশ-দের দেখিয়া ‘এরা খবর না দিয়ে যখন তখন এসে পড়ে কেন’ বলিয়া মা নিশ্চয় যাহার পর নাই বিরক্ত!

তবে মল্লার বিরক্ত অন্য কারণে। পিতাকে সে এতটা অকৃতজ্ঞ ভাবে নাই। নিজের ত্রয়োদশ জন্মদিনের পূর্বের রাত্রে একপ্রকার বশ করিয়া ফেলিয়াছিল নিষ্পাপ বালক। প্রমোশনের একটা আশা তখনো জিইয়া রাখিয়াছিলেন বড়বাবু। ‘হাত পাত, বল কী নিবি, যা চাস দেব এবছর’। ক্লাসের স্বস্তিক, প্রমিতদের পিতাদের সহিত অমৃতকেও গুলিয়া ফেলিয়াছিল মল্লার। অমৃত ভাবিয়াছিল ক্যারমবোর্ড, কি আর বয়েস - একটু খেলিবে না? বাড়ি এসে তাহার নিজেরও খেলা হবে, অথবা সাইকেল, উহার পশ্চাতে ধাবন করিতে করিতে তাহার নিজেরও কিছুটা চর্বি-দোষ ঝরিবে এইসব সাতপাঁচ ভাবিতে ভাবিতে হঠাৎ করিয়াই তৃতীয় দিবসের মাথায় সে এক ভীষণ আবদার করিল, আর মঞ্জুও ‘কি আছে, ছেলেটা কোনোদিন মুখ ফুটে কিছু চায়নি, কিনেই ফেলো না...’ গোত্রের ছেঁকা দিল, অমৃত মনে হইল জানকী ব’লিয়া তাহলে কেহ ছিলই না, ভূমি যে কেন আর ফাঁক হয়না? গরমের দোহাই দিয়া সে যখন ছাদে বেড়াইতে গেল, অমৃতর মনে হইল পাশের পাকুড় গাছটা এবছর একটু বেশীই স্থির, তারাগুলোর কাঁপনেও কেমন যেন মন্থরতা। তারপর অনেক রাত্রে বিভাজিকা হইতে শ্রান্ত কুন্তলরাশির আড়ালটা সরাইতে যাইতে মঞ্জুর চকচকে চক্ষুতে প্রশ্ন দেখিয়াছিল সে। ‘বাইরেটা চমকাচ্ছে মনে হয়, কিছু শুনতে পাচ্ছো?’ অমৃত মাথা নাড়িয়াছিল, ‘হ্যাঁ’। ‘কী শুনছ?’ অমৃত উত্তর দিয়াছিল - ‘দরবারি কানাড়া’।

ধীরাবৌদি গাহিত। আর দুপুরে ভীমপলাশী। জুন। ঝটিকা সফরে পাহাড়ে ছিল সেবার। অফিস ট্যুরে। প্রায়ই আসিতে হইত নর্থে ব্রাঞ্চ মিটিঙে। ওখানেই উঠিত। ধীরামাতা। স্বামীজির মিস ওলিবুলের মতো। দেবেশদা ঠাট্টাচ্ছলে খ্যাপাইত। সেই দেবেশদা আর নাই। আছে, তবে মেডিকেল কলেজের ডোনেট কড়া বডিগুলির মতো। অঙ্গগুলি ব্র্যান্ডির গভীরে ডুবিয়া থাকে। সেতুর অভাবে। অমৃত জানে। টেনশনে ছিল। তবে ধীরাবৌদি বলিত কোল আলো ক’রে আসিবে। মঞ্জুর ব্যথা বাড়িল। রাত্রেই খবর পায়। ধীরাবৌদির ঘর থেকে ভাসিয়া আসছিল। সেই রাগ। রাতের রাগ। অমৃতর কু ডাকিল। আগের দুবারে ডাকেনি। প্রথমবার মঞ্জুকে দেখিতে দেওয়া হয় নাই। অমৃত দেখে। মাংসপিণ্ড। টকটকে লাল। মুখ, চোখ, আঙ্গুল। চুপ। দ্বিতীয়বার স্থপতি কৃপণ হইয়া পড়ে। সময় নষ্ট করে নাই। ছ’মাসেই ভার্ডিক্ট। কিছু হই নাই। কিছুই না। রক্তপাতের পর মঞ্জু আচমকা চুপচাপ হইয়া যায়। আর চেষ্টা করে নাই। তবে জোরটা অমৃতর পক্ষ থেকেই ছিল। না, ঠিক চ্যালেঞ্জ হিসাবে নহে। শরীরের তাগিদে। সেদিন শেষ রাতেই এনজিপির মার্শাল। বৃষ্টি। সারমেয় এবং মার্জারের অকথ্য কলহ। একটা ইউ টার্নে হিসাব ভুল হইয়া যায় লেপচা ড্রাইভারের। ওপাশের সুমোটি ঠিক সময়েই ব্রেক কষিয়াছিল। খাদ আর জীবনের মাঝখানে সীমাবদ্ধ অমৃতর মনে হইয়াছিল কেহ যেন কানে কানে বলিতেছে, ‘ধুর বোকা, মুখটাই তো দেখলি না। এখন যাবি কি?’ দ্বিতীয় কোনও চিন্তা মাথায় আসে নাই। জন্মমুহূর্তেই মল্লারের নামকরণ করিয়া ফেলে গর্বিত পিতা। টানাপড়েনে অফিস যায় সাড়ে তিনদিন পর। তাহারও দিনকয়েক পরে পাওয়া সংবাদটি একটুও বাসি মনে হয় নাই অমৃতর। তাহার দার্জিলিং হইতে ফেরার দিন সকালে দরজা ভাঙ্গিয়া খুলিতে হইয়াছিল ধীরাবৌদির পড়শিদের। ‘ওটা আমার’, বলিয়া দড়িটার দিকে বারংবার হিংস্র জটায়ুর মতো উড়িয়া যাইবার উপক্রম করিতেছিল দেবেশদা। বালিশের আড়ালে পড়িয়াছিল একটি শব্দের চিরকুট। পুলিশ দেখিয়া ফেলিয়া দেয় – ‘শান্তি’।

শান্তি। মঞ্জু দেখিত। ডিডি ওয়ান। ধর্ষিতা মায়ের ধর্ষকদের খুঁজিয়া বাহির করাকেই জীবনের ধ্রুবতারা মানা একটি কন্যার করুণ কাহিনী। পর্বগুলিকে টানিয়া টানিয়া পরিচালক দ্বিতীয় আরেকটি ধর্ষণ যন্ত্রণা উপহার দিতেন। মল্লারের তখন ফাইভ। খবর আসে ল্যান্ডফোনে। মঞ্জুকে জোর করিতে হয়নি। ট্যাক্সি। কলকাতা শহরকে সহসা এক স্লো-মোশনে অভিনীত পর্ণোগ্রাফিক ছবির মতো মনে হয় অমৃতর। গরম। কেষ্টর মুখ ভাসিয়া ওঠে। অন্তিম কথোপকথনটি এরকম ছিল- ‘আগেরবার যাইনি, এবার পুজোয় মেয়েটাকে দেখতে যাবই অমৃতদা’। ‘কোথায় যেন বাড়ি বলেছিলি? হালিশহর, না?’ মেয়ে। হিসেবের খাতায় ওরকম একটি মেয়েকেই দেখিতেন রামপ্রসাদ। কেষ্টর দেখা হয়নি। অমৃতর হইয়াছিল। ডাক্তার আসে। সেভায়ার কিছু নয়। ‘গরমটা বাচ্চাটা নিতে পারেনি, সেন্সলেস হয়ে গেছিল’। চোখা উত্তর ডাক্তারের। টানা একটা হপ্তা মল্লারকে স্কুল যাইতে দেয়নি মঞ্জু। মল্লারের নিকট, মল্লারদের নিকট গ্রীষ্ম এরকমই, বিভীষিকা। ঈশ্বরচন্দ্র মাইলপাথর খুঁজিতে খুঁজিতে কিংবদন্তী হইলেন, তাঁহার নিজের পিতামহ ঘর্ম মুছিতে মুছিতে ছাত্র পড়ালেন, অথচ, অমৃত হাসিল, মাথা চুলকাইল, মল্লারদের দোষ নাই, লড়াই তাঁহার আগের প্রজন্মতে এসে অকস্মাৎ ব্রেক কষিয়াছে। কিম্বা, সেবার। কর্ণমূলের নীচে ছোট ছোট দানা। মঞ্জুই প্রথম দেখাইল। গা সিরসির ক’রে উঠিয়াছিল অমৃতর। সরমা, পাড়ার দিদি - কটু বাক্যে ডানাকাটা যাহাকে বলে সেরকমই। বিবাহে মন নাই। পাড়ার বাচ্চাদের সহিত সময় কাটাইত। ‘মার্গারেট’ – আড়ালে বলিত দাদা-কাকা-রা। অমৃত আইরিশ দেখেনি, তবে দেখিয়াছে অসুখ কাষ্ঠের অলিগলিতে ঢুকিয়া কিভাবে মরিচা ফেলে, সরমাদির দৃষ্টি যাইল, চক্ষুর নিচের দিকের চক্রবত চিহ্নগুলো দেখিয়া শুভানুধ্যায়ীরা প্রথম দুদিনের পর হইতে মুখ ঘুরিয়া পলাইত। কাগজের স্যাঁতস্যাঁতে ক্লাসিফাইডে করিয়া বয়স্কা মা’র পছন্দের জিলাপি আনিতে যায় সরমাদি, পাড়ার দোকানে। বাচ্চাদের সঙ্গ ছাড়িয়া দিয়াছিল, নাকি ভাইসে ভারসা, তাহা নিয়তি জানেন। যাহাই হউক। গ্রীবা ছাড়াইয়া নিচের দিকে দুএকটা। রাতে ঘুসঘুসে। ‘বাবা, ভাল্লাগছেনা,’ বলিয়া খাইতে চাইত না। মঞ্জু ধকধক বুকে চেম্বারে গিয়াছিল। রিকশায় অমৃত দুএকবার ‘আরে, আমি আছি তো’ ...’এখন কিছুই হয় না’ গোত্রের চিত্রনাট্যের বাহিরের ডায়লগ বলিতে গিয়া তোতলাইতেছিল। আর এবারো ডাক্তার ... ‘সিরিয়াস কিছু বুঝছিনা। মুখগুলো সেরকম শেপ নেয়নি’। ‘আর জ্বরটা?’ ‘ইটস আ মেয়ার কোইন্সিডেন্স। অ্যালার্জি। সেরে যাবে। গরমে রাখবেন না। নিতে পারেনা’। বক্ষ হইতে প্রস্তরখণ্ড খসাইয়া এক রমণী সেদিন বেশ খোলামেলা হইয়া গিয়াছিল, জ্বরটা একটু কমা পুত্রকে একপাশে রাখিয়া, অমৃত সুখী হইতে পারত অনেকটা, যদিও তাহার মনে হইয়াছিল, বক্ষ হইতে প্রস্তরটা তাহার সেদিন কে যেন নতুন করিয়া বসিয়া দিল। অমৃত সাড়া দেয় নাই।

তবে মঞ্জু দেয়। একবার, দুবার, তিনবার ডাকার পর। চোখে বিরক্তি। সচরাচর। অভ্যাস হইয়া যাইবে, ভাবিতে ভাবিতে, অমৃত অদ্যাবধি অভ্যেস করিতে পারেনাই। কখনো কখনো মল্লারের সামনেই। মহাকাব্যের যুদ্ধের মতো দেয়ালের এদিক হইতে ওদিকে গিয়া দুটো তীর মেঝেয় আসিয়া পড়ে। মল্লার, নেহাতই শিশু হইলে, সেসবই কুড়িয়া রাত্রের দুঃস্বপ্নে হাসিয়া উঠিত হয়ত। কিন্তু, তাহার বোধ বাড়িতেছে। উঠিয়া ওঘরে চলিয়া যায়। টম জেরির লড়াইয়ের শব্দ বাড়াইয়া দেয়। বেড়ালটা এ বাড়ি হইতে ও বাড়ি লাফাইয়া পড়ে। অমৃতর চক্ষু জানালা বরাবর চকচক করিয়া ওঠে। সোফাসেটের বয়স হইয়াছে। মল্লার শুইয়া থাকিয়া এতক্ষণে উঠিয়া বসিয়াছিল। অমৃতর হইতে সরাইয়া তাহার দৃষ্টি এখন এক খালি ঘর সুডোকুর দিকে। মনে হইল অগ্রসর হইতেছে। আরে, অমৃতর কী আর দিবার আছে! শুনিয়াছে, মঞ্জু নিজে, গেল সপ্তাহে, দোকানে যাইয়া দর করিয়া আসিয়াছে। মালিকের সহিত চৌমাথার মোড়ে দেখা। ‘ওঃ, এদ্দিনে মাছ ধল্লাম’, গোত্রের ইঙ্গিত। ‘আঃ’, অমৃত আঙ্গুল সরাইতে সময়জ্ঞানে ভুল করিয়ে ফেলিল। জানালা দড়াম করিয়া... হউক, এ ব্যথা বেশ মজার। মল্লার আগুয়ান। একটিমাত্র পুতুল ছিল ঘরে। পাতা পরিত, শোয়ালে, বসালে। অমৃত, ছোট্ট অমৃত ধারেকাছে ঘেঁষিত না। ঘরে কেহ না থাকিলে, পুতুলটা যেন তাহার দিকেই এগুত। এক, দুই, তিন পা। মল্লারকে ওরকম লাগিতেছে। মঞ্জু ছাদে কাপড় তুলিতে ব্যস্ত – তাড়াহুড়োয় সবকটিই তোলে যেন। পিসি বাড়ি এলে দিদি-ভাই মিলিয়া বাটি বসাইতে যাইত রোয়াকে, দাদু বলিত আদিখ্যেতা, সেজকাকা হেমন্ত ধরিত, ‘সাতমহলা স্বপ্নপুরী, নিভল’ ... সে স্বপ্নপুরী অমৃত জানে বাস্তবিকই নিভিয়া গিয়াছে। মঞ্জুর দৌড়ের শব্দ আসিছে। তারপর বেশ কিছু ঘর্ষণের পর নীরদপুঞ্জ একসময় সাবালক হয়, রূপ পাল্টায়, ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম ও শেষ মাইলপাথরের নিকটবর্তী কোনও একটা দূরত্ব পার হইয়া প’র সুকিয়া স্ট্রীটে যখন আসিল, ‘শুনছ, বুড়িকে দেখতে এসেছে’ ব’লিয়া বয়সী কৃষ্ণকলির পিতার মতো পাত্রপক্ষ আহরণের জন্য সঙ্গে একটি মিষ্টান্নর প্যাকেটের মতো বজ্রপাত নিয়াও আসিল। মঞ্জু ততক্ষণ ছাদ হইতে নামিয়া বাহিরে। মল্লার এগোতে এগোতে থামিয়া গিয়াছে। কর্ণকুহর অনুমানে অক্ষম দুই হস্ত দ্বারা পরিবৃত থাকায় সে শুনিতে পায় নাই অমৃতর অস্ফুটে ‘আঃ, এখন দিন দুয়েকের শান্তি’।

অমৃত কহিল – ‘আয়’ ....