গল্প : মণিশঙ্কর

ভাত-ভাতারের গপ্প

শান্তির জীবনে আর ছিটেফোঁটাও শান্তি বেঁচে নেই। সকাল হতে না হতেই একশো বিঘার মাঠটা থেকে বুলড্রজার, জিপসি আর সিমেন্ট মিক্সার চলার একটানা ঘরঘর শব্দ ভেসে আসছে। অথচ রোদের রঙ্ দেখে আতঙ্কে ঘর থেকে বেরোতে সাহস পাচ্ছে না কেউ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন আগুন ঝরছে আকাশ থেকে আর মাটি থেকে উঠছে তারই লকলকে শিখা চেরা জিভের মতো। এমন কি কাক-পক্ষীরাও কোনো ছায়াঘন নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে ঠোঁট ফাঁকা করে হাঁপাচ্ছে অসহায় ভাবে। চাঁদিফাটা খরখরে রোদে জ্বলে খাক হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। খাক হয়ে যাচ্ছে শান্তির জীবনটাও।

উঠোনের পাশে আঁকড় গাছের গুঁড়িতে বাঁধা পাগা অর্থাৎ বলদ বাঁধার দড়ি খুলতে খুলতে সেই কথা নিয়েই গরগর করে শান্তি,

উঃ, জিউটা আমার জ্বলে গেলেক্ গ! এমন জিউ-এর মুয়ে ঝাঁটা মারি! কতবার করে বল্লম, ওগ, কিছুই যখন রইলেক্ নাই তখন ই জঞ্জালগুলাকে খেদ, খেদ। ত শুনলেক্ আমার কুথা! খাটে মরব আমি, ত উয়ার কীটা!

কী হলেক্ গ খুড়ি? সুকাল বেলাতেই ই রকম গজর গজর কচ্চ কার সঙে?

বাঁ হাতে একটা লোহার ধামা আর ডান কাঁধে একটা দাঁড় কদাল নিয়ে যে লোকটা জনশূন্য রাস্তা দিয়ে পেরিয়ে যাচ্ছিল সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করে শান্তিকে। তার প্রশ্ন শুনে খ্যাঁক করে ওঠে শান্তি, হাঁ যমের সঙে কচ্চি বাপ্। বলচি, আর ক্যানে! ইবারে আমাকে তুলে লিঁয়ে যাও। অ্যানেক্ সুখ ই জীবনে পালম্ আর সুখে কাজ নাই বাপ্!

ছি ছি! উ কী কুথা বলচ খুড়ি! ই সুকাল বেলাতে উ সোব অলুক্ষণ্যা কুথা বলতে নাই গ। ত, জনককাকা এখন কেমন পারা রইচে?

উয়ার আবার থাকা! আচ্ছা, তুইয়েই বল ক্যানে, শুধু কি উয়ারেই সোব গেছে! তুদের কারুর কিছু যাই নাই? কই তুরা ত কেউ উয়ার পারা তামাসা করে বুলিস্ নাই! যেমন দিনকাল তেমনি করে সোব লিজদেরকে বদলাঁই লিলি। আর উ! সাদে কি আর বলচি, জিউটা আমার জ্বলে গেলেক্ বাপ্। আর ভাললাগে নাই আমার।

হঁ, ই কুথাটা তুমি ঠিকেই বলেচ। গেছে ত সোবাইয়েরেই সোব।

লোকটি কাঁধের কদাল ধরেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

তবে সেও ত বছর ঘুত্তে গেলেক্। এখন তা লিঁয়ে শোগ কল্লে প্যাট চলবেক্? তাথেই যে যা পাচ্চে তাই করে প্যাটের ব্যবস্তা কচ্চে। ত, তুমি একটুকুন্ বুজাঁই বল নাই ক্যানে জনককাকাকে?

বলি নাই আবার! বলে বলে হেরোপাট হয়ে গেছি বাপ্। ত আমার কুথা শুনলে ত। অই হঁইচে উয়ার সারাক্ষণের জপমালা।

সে কুথাটাও ঠিকেই বটে। আমরা ত চোখের কাছটিতে দেখচি সোব।

তবে! তুরাই বল ক্যানে, আমার ই বুড়া হাড়ে আর ই সোব ভাললাগে? তাথেই দিনরাত যমকে ডাকচি।

আঁকড় গাছের গোড়া থেকে পাগাটা খুলে দিতেই বলদটা ফোঁস ফোঁস করে উঠোনের আরেক পাশে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালটার দিকে ছুটে যায়। শান্তি সে দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য বলদটার দড়িতে হাত দেয়। দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি সহানুভূতি জানিয়ে বলে,

এমন করে বলো নাই খুড়ি। ত, তুমি ব্যাটাদেরকে খবর দাও নাই? উয়ারা আসে কিছু একটা ব্যবস্তা করে দিঁয়ে যাক।

সোব দিঁয়েচি বাপ্! সোবাইকে সোব খবরেই দিঁয়েচি। কিন্তুক্ উয়াদের কী আর সে সোময় রইচে! ছুটুটি ত আর নাই কেউ। দিন যখন ছিলেক্ তখন সোবাই ছিলেক্ বাপ্! এখন উয়ারাও সোব লায়েক্ হঁইচে।

দ্বিতীয় বলদটির পাগা খুলে দেয় শান্তি। ঝুঁকে যাওয়া কোমরটা সোজা করে দাঁড়ায়। লোকটি শান্তির কোমরের দিকে তাকিয়ে আবার বলে,

তা বল্লে হবেক্ ক্যানে! টাকা পুয়সা যা পাঁইয়েছিলে তার ভাগভুতা ত সোবাই পাইপুয়সা বুজে লিঁয়েচে। এখন ঘাড় থাকে সোব ঝাড়ে ফেলতে খুঁজলে চলবেক্ ক্যানে!

সে কুথা এখন কে কাখেইবা বলবেক্ আর কেইবা শুনবেক্ তা বল। যখন লিখিত-পড়িত হয় নাই তখন ফি দিনকে আসে তাগাদা দিতে লাগলেক্ সোবাই। আর এখন ত সোব হঁয়ে গেছে। ত, এখন আর বুড়াবুড়ির খোঁজ কে লিবেক্ বাপ্!

শান্তির গলায় কিছু যেন একটা আটকে যায়। বাইরের উত্তপ্ত বেলার মতো জ্বালা করে আসে তার বুকের ভিতরটা। গলা দিয়ে কিছু একটা বেরিয়ে আসতে পারলে যেন খানিক স্বস্তি পায়। কিন্তু কী সেটা! শান্তি বুঝতে পারে না। যেমন বুঝতে পারে না, তার সাধের সংসার এমন ছারখার হয়ে গেল কেন! কেন তার লোকটি দিনদিন এমন অচেনা হয়ে যাচ্ছে!

কিন্তু শান্তির মনের এসব খবর কেউ রাখে না। পাড়ার লোকেরা পথ চলতে সহানুভূতি জানায় বটে কিন্তু সকলেই নিজের পেটের চিন্তায় ব্যস্ত। তাই যার আগুন তার জ্বালাও তাকেই পোয়াতে হয়। হচ্ছেও তাই।

এই যেমন কদালধারী লোকটি। দাঁড়িয়ে থেকে আর দু’টো কথা বলার মতো সময় পায় না। তাই একটা পা বাড়িয়ে বলে,

খুড়ি, যদি কিছু মনে না লাও ত একটা কুথা বলি। তুমি একবার গ্যানা দিয়াসীকে ডাকে দেখাও। আমার মনে লেয় কনু বাও-বাতাস –

ই তুই কী বলচিস!

এ কথাটা যে শান্তির কোনোদিন মনে হয়নি তা নয়। কতবারই তো মনে হয়েছে, রাত নেই বিরেত নেই যখন-তখন লোকটা যা করে বেড়াচ্ছে তা কোনো বাও-বাতাসের কাজ না হয়ে যায় না। তবু এখন অন্যের মুখ থেকে সে আশঙ্কার কথা শুনে শান্তির মনটা হঠাৎ আঁতকে ওঠে। কিছু একটা বলতেও যায়। কিন্তু তার আগেই পিছন থেকে শুনতে পায়,

ই বাবা! হারা, না কে বটিসরে?

সে দিকে তাকিয়ে দেখে, চালা ঘরটা থেকে বেরিয়ে আসছে অর্দ্ধনগ্ন জনক। কোমরে নেংটির মতো করে একটা গামছা পাছার অর্দ্ধেক বের করে পিছন দিকে ছোট গোঁজা। আরেকটি গামছা মাথায় পাকবাঁধা। বাকি সব উদোম। ডানহাতে একটা ছোটো লাঠি, যাকে বলে হেলেবাড়ি, তা নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে এসে অনুযোগের সুরে বলে,

হ্যাঁরে হারা, তুদের বীচতলা জতরান হঁয়ে গেলেক্ আর আমাকে এককথা জানালি নাই তক্ক! বটেরে বাপ্!

তারপর শান্তির দিকে তাকিয়ে ব্যস্তসমস্ত হয়ে তাড়া দেয়,

কই গ, দে দে, তাগাদা করে মুড়ি গাঁটটা দে ত। আমি যাই। অ্যানেক দেরি হঁয়ে গেলেক্।

কুথাক্ যাবে কুথাক্ শুনি?

জনকের তাড়ার উত্তরে ডান হাতখানা উঁচিয়ে খ্যাঁক করে ওঠে শান্তি। জনক অবাক হয়ে বলে,

ই বাবা! হাল জুড়তে হবেক্ নাই? সোবাইয়ের বীচতলা করা হঁয়ে গেলেক্। জ্যোষ্টি মাস পেরাঁই গেলে আর বীচ ফেলা যাবেক্ ভাবেচিস্! দে দে ত। আর দেরি করিস্ নাই।

দেখচিস্ ত, দেখ! এমনি করে সারা দিন আমাকে জ্বালায়েপুড়ায়ে খাবেক্। শুদুই বলবেক্, মাঠকে যাই।

শান্তির অনুযোগ শুনে হারা নামের লোকটি কিছু বলতে যায় কিন্তু তার আগেই জনক তাকেই বলে,

হ্যাঁরে, তুদের সোব মাঠেই সার চালানোও হঁয়ে গেছে?

না, না কাকা। আমাদের এখনঅ কিছুই হয় নাই।

হারা আশস্ত করতে চায় জনককে। কিন্তু তাতে জনকের মনের উদ্বেগের কণাগুলো বিন্দুমাত্র থিতোয় না। বরং তারা তাকে আরও বিচলিত করে তোলে। দু-একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে হারাকে তাড়া দেয়,

কিছুই হয় নাই ত ইখ্যানে দাঁড়ায় দাঁড়ায় কী কচ্চিস্? যা যা, হাল জতরাগা যা। আমিও হেলা দু’টাকে জুড়ে লিই।

এর উত্তরে কী বলবে হারা কিছুই বুঝতে পারে না। এরকম একটা লোককে আসল কথা খুলে বলেও তো কোনো লাভ নেই। তবু একবার একটু ইতস্তত করে বলে,

কাকা, এখন আর হাল জতরায়ে কী হবেক্ বল! এখন কি আর উগুলা চাষের রইচে গ! সোব এখন বসত –

মারব শালাকে এখনি টানে এক চড়!

হারার কথা শেষ হওয়ার আগেই আচমকা সটান একটা চড় তোলে জনক। ধেয়ে যায় হারার দিকে। চমকে গিয়ে হারা দু’পা পিছিয়ে যায় সঙ্গে সঙ্গে। শান্তি হন্তদন্ত হয়ে জনককে ধরে ফেলে,

ই তুমি কী কচ্চ? লোকের ছেলার গায়ে বিনা দোষে হাত তুলচ!

দেখলি, তুই দেখলি ত, চাঁদির ছাঁয়ে কী বলচে দেখলি ত! চাষ না হলে সমবছরটা খাবি কী শুনি? ছাড়, ছাড় বলচি আমাকে। আজ শালা ছাঁয়ের ভসের ভূত খেদে ছাড়ব। মুয়ে যা আসবেক্ তাই বলবেক্!

ঝাঁকুনি দিয়ে শান্তির হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চায় জনক। শান্তি তাকে ধরে থেকেই বলে,

ক্যানে, উ কী কল্লটা কী, শুনি? উ ত ঠিক কুথাই বলিচে! আর এ হারা, তুই আবার দাঁড়াই থাকে কী তামাসা দেখচিস্? যা, যা, যুথাকে যাচ্ছিলি চলে যা বাপ্।

শান্তির তাড়ায় হারা সম্বিৎ ফিরে পায়। তাড়াতাড়ি দু’পা ফেলে বলে,

তুমি গ্যানা দিয়াসীকেই খবর দাও খুড়ি। গতিক আমার ভাল ঠেকচে নাই।

আর কিছু বলে না। এগিয়ে যায় গাঁ-কুলিটার দিকে। সে দিকে তাকিয়ে জনক দেখতে পায় দূরে কতকদুলো মেশিন গাঁকগাঁক শব্দ করে ঘুরছে ফিরছে। হঠাৎ জনকের খুব ক্লান্ত লাগে। সারা শরীর নেতিয়ে আসে। ধীরে ধীরে মাথাটা শান্তির কাঁধে এলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে,

কেলাশ-আশধান-আশ্বিনলয়ার সোময় পেরাঁই যাচ্চে। এখনি বীচতলা কত্তে হবেক্। জমিতে সার চালাতে হবেক্। জল হঁয়ে গেলে আবার সারকুড়গুলান জলে ভত্তি হঁয়ে যাবেক্ – কেলাশ – আশধান – আশ্বিনলয়া –

শান্তি জনকের সে বিড়বিড়ানির কোনো উত্তর দেয় না। তাকে ধরে ধীরে ধীরে ঘরের দিকে নিয়ে যায়। এই সময় কোথায় একটা দাঁড়কাক, যাকে এ অঞ্চলের লোকেরা যমদূত বলেই জানে, সেটা সুর করে ডাক ছাড়ে,

কাআআআআআআ – কাআআআআআআআআআআআ – কাআআআআআআআআআআআআ

সেদিকে তাকিয়ে শান্তি কাকটার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে,

দূর দূর – তুর মুয়ে ছাই। লিতে আসার আর লোক পালি নাই তুই!

কিন্তু তার সে চিৎকার সম্ভবত কাকটার কানে যায় না। একই সুরে প্রখর রোদের হাঁসফাঁস প্রকাশ করে সে,

কাআআআআআআ – কাআআআআআআআআআআআ – কাআআআআআআআআআআ –

কোনো কিছু কানে যায় না জনকেরও। না চিৎকার, না কাকের ডাক। শান্তির কাঁধের উপর শরীরটা ছেড়ে দিয়ে ঘরের দিকে এগোতে থাকে আর ক্লান্তি জড়ানো গলায় একইভাবে বিড়বিড় করে,

কলমকাঠি – দুধনোনা – পাটনাইনোনা – রঘুশাল – সীতাশাল – ধুন ফুল ফুল ফুল...

এতক্ষণ মাথা নীচু করে চুপচাপ বসেছিল জনক। হঠাৎ তারস্বরে একটা চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ে গ্যানা দিয়াসীর উপর। দু’হাতে তার গলাটা চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত ঘসে বিড়বিড় করে,

শালা হারামি! আমার উপরে ক্যাদ্দারি, আঁ! আমার উপরে!

এমনটা যে ঘটতে পারে উপস্থিত কেউই তা আশা করেনি। গ্যানা দিয়াসী তো করেইনি। তাই জনকের এমন আক্রমণ সে প্রতিহত করতে পারে না। ধপাস করে পড়ে যায় চিৎ হয়ে। কিন্তু এ বিহ্বলতা মুহূর্তের জন্য। প্রাথমিক চমকটা কেটে যেতেই ছুটে যায় গ্যানা দিয়াসীর ছেলে ফটিক। পিছন থেকে জনককে ঝাপটে ধরে টানতে থাকে গায়ের সমস্ত শক্তি এক করে। কিন্তু একবিন্দু নড়াতে পারে না। তা দেখে এগিয়ে আসে আরও কয়েকজন জোয়ান ছেলে। বেশ কিছুক্ষণ টানাটানি করতেই দিয়াসীকে ছেড়ে ফেলে জনক। অমনি দুমদাম কয়েকটা চড়-কিল-ঘুষি বসিয়ে দেয় ফটিক। শান্তি গোল করে কান্না জুড়ে দেয়,

ওরে উয়াকে তুরা অমন করে মারিস্ নাইরে – উ যে মরে যাবেকরে –

ফটিক সে কান্নাকে তোয়াক্কা না করে চিৎকার করে,

বল, কে বটিস তুই? বল, বলচি।

জনক কোনো উত্তর দেয় না। চোখজড়া তার আমড়া আঁটির মতো হয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়। দাঁতে দাঁত ঘসে কিড়মিড় শব্দ তুলে বলে,

রক্ত খাব – আমি তুদের সোব ক’টার রক্ত খাব।

রক্ত খাবি? দাঁড়া শালা, খাওয়াচ্চি তুখে রক্ত! বল কে বটিস তুই?

আরেকটা ঘুষি জনকের তলপেটে বসিয়ে দেয় ফটিক। অমনি জনক তলপেটটা ধরে বসে পড়ে সেখানেই।

দাও দাও খুড়ি, একটা দড়ি দাও।

হারাই চিৎকার করে দড়ি চায়। হতভম্ব শান্তি কী করেব বুঝতে পারে না। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে বলে,

আঁ, দড়ি! ই রাতের আঁধারে এখন আমি দড়ি কুথাতে খুঁজবরে বাপ্?

ফটিক অবশ্য দড়ির জন্য অপেক্ষা করে না। জনকের হাতজোড়া পিছন দিকে করে বেঁধে ফেলে নিজের গামছাটা দিয়েই। জনকের শরীরটা এলিয়ে পড়ে। তবু মুখে গঁ গঁ শব্দ করে একই শব্দ বিড়বিড় করে যায়,

রক্ত খাব – তুদের রক্ত খাব –

গ্যানা দিয়াসী এতক্ষণ কাছে ঘেঁষেনি । ছাড়া পেতেই ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে কাশতে কাশতে গলায় হাত বোলাচ্ছিল। এবার এগিয়ে এসে জনকের সামনে বসে বলে,

একটা মুড়া ঝাঁটা লিয়ে আয় ত।

শান্তি দাওয়া থেকে ঝাঁটাটা এনে গোল তোলে,

অগ, আমার কী হবেক্ গ! কে চাপল গ উয়ার ঘাড়ে?

জমা হওয়া লোকেদের কেউই সে প্রশ্নের উত্তর দেয় না। গ্যানা দিয়াসী বিড়বিড় করে মন্ত্র উচ্চারণ করে। সঙ্গে চালায় ঝাঁটার বাড়ি।

বল, কে বটিস্ তুই?

না বলব নাই। আমি তুর রক্ত খাব।

রক্ত খাবি? লে খা রক্ত।

ঝাঁটাটা পাশে নামিয়ে রেখে তার ঝোলা থেকে এক মুঠো লঙ্কার গুড়ো বের করে গ্যানা দিয়াসী। মুখের সামনে তুলে বিড়বিড় করে কী সব হাবিজাবি। তারপর ফু দিয়ে উড়িয়ে দেয় সেগুলো। অমনি জনকের সারা শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে আসে। দম বন্ধ করে মুখ দিয়ে একটানা গঁ-অ-অ-অ-অ-অ শব্দ করে। ফটিক চেপে ধরে জনককে। গ্যানা একই ভাবে ওড়াতে থাকে লঙ্কার গুড়ো। এক সময় জনক হার স্বীকার করে বলে,

বলচি বলচি। আমি – আমি হলম কিষ্ট।

কিষ্ট? উম্! রসক্যা লাগর একবারেই। কন্ কিষ্ট সেইটা বল।

কন কিষ্ট? এখন তুরা আর কিষ্ট মুখুজ্জ্যাকে চিনতে লাচ্চিস লায়? শালারা সোব যখন আমার জমিতে চাষ কচ্ছিলেক্ তখন ত ফি দিনকেই আমার নাম হাজারবার লিথক্ মুখে।

কিষ্ট মুখুজ্জ্যা!

উপস্থিত সবার মুখ দিয়েই অস্ফুটে যেন একটা আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। আর কিছুই বলতে পারে না কেউ। আতঙ্কে সবক’টা মুখ থমথম করে। শুধু গ্যানা দিয়াসী গড় হয়ে জনককে প্রণাম করে বলে,

তা হে বাবা বাউন ঠাকুর, তুমি এতবড় মানুষ হঁয়ে ইয়ার পারা গরিবের ঘাড়ে চাপলে ক্যানে বাপ্?

চাপব নাই! শালা এতদিন আমার জমিতে চাষ করে এখন সেগুলাকেই বিকে দিলেক্ হাঁ বসতের লাগে!

এবার শান্তি এগিয়ে আসে। জোড় হাত করে কাঁপতে কাঁপতে বলে,

হে বাউন ঠাকুর, উয়াতে আমাদের যে কনই দোষ নাই বাপ্! তুমার ছেল্যারাই ত বিকে দিলেক্ সোব।

উয়ারা বিকে দিলেক্ আর তুরা সোব ছাড়ে দিলি! আমি বুঝি নাই কিছুই, লায়? সোব টাকার মুথুল পাঁয়ে ভুলে গেলি।

তা আর কী করব ঠাকুর!

এবার হারাও এগিয়ে আসে জনকের কাছে। শান্তির মতো সেও হাতজোড় করে বলে,

আমরা কী করে বাধা দুব ঠাকুর? তুমি যাওয়ার পরে জমি যে সোব তুমার ছেলাদেরেই হঁইচে। আমরা ভাগচাষী। আমাদের কি সে ক্ষ্যামতা রইচে!

তুই শালা হারামি, চুপ দে। জমি দিয়ে এখন তুই শালা উয়াদের খ্যানকে যাচ্চিস্ গতর খাটাতে, সে আমি জানি নাই ভাবিচিস্?

তা আর কী করব ঠাকুর! প্যাট ত চালাতে হবেক্! যেদিন তুমার ছেল্যারা বিকতে আলেক্ শহর থাইকে, সেদিনকে আমরা সোব কত হাতে-পায়ে ধল্লম। বল্লম, বাবু জমি বিকে দিলে আমরা খাব কী? আমাদের যে আর কনু কাজেই জানা নাই। কিন্তুক্ আমাদের কনু কুথাই শুনলেক্ নাই। বল্লেক্, আমরা আর ত কেউ গাঁয়ে ঘুরে আসব নাই। ভাল দাম যখন পাচ্চি তখন – তাবাদে তুদেরকেও ত খালি হাতে কিছু দিতে বলি নাই। ইবারে তুমিয়েই বল ক্যানে ঠাকুর, আমরা গরিব মানুষ আর তুমার ব্যাটারা – আমরা কি আর উয়াদের সঙে পারি!

হঠাৎ জনক খেপে ওঠে। মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরিয়ে আসে। সঙ্গে গঁ গঁ শব্দ। সারা শরীরে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু তার আগেই গ্যানা দিয়াসী আবার একমুঠো লঙ্কা ছুঁড়ে দেয় তার মুখের সামনে।

বহু কষ্টে কিষ্ট মুখুজ্জের ভূত জনকের কাঁধ থেকে নামিয়েছিল গ্যানা দিয়াসী। মন্ত্রের জোর কিংবা লঙ্কাবান কোনটাই কাজ করেনি। শেষে অনেক কাকুতি-মিনতি করে, হাতে-পায়ে ধরে, গরিবের দোহায় দিয়ে ছেড়ে যেতে রাজি করিয়েছে।

শান্তির মন এখন অনেকটাই শান্ত। সেদিনের পর থেকে জনক আর যখন-তখন মাঠে হাল নিয়ে যাওয়ার জেদ ধরে না। নানান ধানের নাম বলে আশ্বিনসংক্রান্তির ধান ডাকার ছড়া কাটে না। চুপচাপ দাওয়ার খুটিতে ঠেস দিয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে লম্বা করে ছাড়ে দীর্ঘশ্বাস। এমনকি সব কিছু যাওয়া সত্ত্বেও যে বলদগুলোকে বিক্রি করতে সে এতদিন রাজি হয়নি, এখন সেগুলোতেও তার কোনো টান নেই।

এই যেমন এখন, দাওয়ার খুটিতে হেলা দিয়ে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে উঠোনের পাশের আঁকড় ঝোঁপটার দিকে। ওখানেই বলদ দু’টো বাঁধা রয়েছে। দু’টো লোক ঘুরে ফিরে চারিদিক থেকে দেখছে তাদের। আর শান্তি একটু দূরে দাঁড়িয়ে লোকগুলোর উদ্দেশ্যেই যেন কিছু বলছে। কিন্তু সে সব কিছুই কানে আসছে না জনকের। বরং তার দু’কান ভরে জেগে রয়েছে বুলড্রজার-জিপসি আর সিমেন্ট মিক্সার চলার একটানা ঘরঘর।

বেশ কিছুক্ষণ একভাবে বসে থেকে জনক ধীরে ধীরে উঠে যায় বলদগুলোর কাছে। যে লোকগুলো তাদের খুঁটিয়ে দেখছিল তাদের একজনের কাঁধে হাত রেখে বলে,

হ্যাঁ আজ্ঞ্যা, হাল জতরাবে? জল লাগাইচে?

প্রথমে লোকটা কিছু বুঝতে পারে না। জিজ্ঞাসু মুখে তাকায় শান্তির দিকে। শান্তিও ঝট করে কোনো উত্তর দিতে পারে না সে দৃষ্টিকে। তার বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। জনক লোকটাকে আবার জিজ্ঞাসা করে,

হ্যাঁ আজ্ঞ্যা, আশধান লাগান হয়ে গেছ, লায়? ইবারে কি আশ্বিনলয়ার চাষ?

ও মুরুব্বি! ই সোব কী বলচ তুমি? আমরা ত –

জনকের কথার অর্থ ধরতে না পেরে কথা অসমাপ্ত রেখেই লোকটা আবার তাকায় শান্তির দিকে।

না, না – বলছিলম শুধু বড় বড় দালান ঘর তুল্লেই হবেক্ আজ্ঞ্যা! দালানের ছাদে কি ধান লাগান যাবেক্?

এতক্ষণে শান্তির আতঙ্কের হতভম্ব ভাবটা খানিক কেটে যায়। তড়িঘড়ি জনকের কাছে এগিয়ে এসে বলে,

আজকে আবার তুমার কী হলেক্? বেশ ত ছিলে ক’দিন!

না গ বাউরী বৌ, হয় নাই কিছুয়েই। বলচি, ইয়ারা কি লতুন কনু চাষ করবেক্ বলে আসিচে?

উফ, ভগমান! ইসোব তুমি কী বলচ গ! উয়ারা হাঁ –

না, বলচি, ধর ক্যানে, ধান চাষ ত আর হবেক্ নাই। তুর ভাতার ত জমি বিকে খালেক্। থালে ইয়ারা বলদ গুলান লিয়ে কী করবেক্? তাথেই শিধাচ্চি। বলি হ্যাঁ আজ্ঞ্যা, দালানের ছাদে চাষ করবে ত তুমতা? লতুন চাষ?

শান্তির চোখ বড়ো হয়ে আসে আতঙ্কে।

অগ, বাউন ঠাকুর যায় নাই গ। আবার আসিচে গ। অরে হারা, আসবিরে –

শান্তির সে চিৎকারে হতভম্ব হয়ে যায় বলদ কিনতে আসা লোক দু’জন। কী বলা যায়, কী করা যায় কিছুই তারা বুঝতে পারে না। ওদিকে শান্তির চিৎকারও কানে যায় না জনকের। দু’কান ভরে চলতে থাকে ঘরঘর - ঘরঘর – ঘরঘর। জনক দু’কান চেপে ধরে বলে,

ভুল, সোবেই ভুল হে, কেলাশ – আশধান – আশ্বিনলয়া ভুল – কলমকাঠি – দুধনোনা – পাটনাইনোনা ভুল – রঘুশাল – সীতাশাল সো---ব ভু---ল---

বীজতলায় ধান ছড়ানোর ভঙ্গী করে সামনের দিকে হাত ছুড়তে ছুড়তে এগিয়ে যায় দাওয়াটার দিকে। কোনো দিকে না তাকিয়ে শুধু বিড়বিড় করে,

ধান ভুল ভুল – দালান দুলদুল – দালান দুলদুল –

সে দিকে তাকিয়ে শান্তি সুর করে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে আঁকড় তলাটাতেই। কিন্তু তার কান্না আর জনকের বিড়বিড় ছাপিয়ে ডেকে ওঠে সেই যমদূতটা – খাআআআআআ – খাআআআআআআআআ – খাআআআআআআআআআআআ –